জয়নালের তথ্যে এনআইডি বানাতো সাগর

জয়নালের তথ্যে এনআইডি বানাতো সাগর

 বিশেষ সংবাদদাতা
  ২০১৯-০৯-১৮: ০৪:৪২ পিএম

মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সরবরাহ করা হয়েছে চট্টগ্রাম থেকেই। এক্ষেত্রে পুরো বিষয়টি ঘটেছে তিনজনের হাত ধরে। যারা বিভিন্ন সময় জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরিতে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল।

তারা হলো- চট্টগ্রাম নগরের ডাবলমুরিং থানা নির্বাচন অফিসের অফিস সহায়ক মো. জয়নাল আবেদীন (৩৫), নির্বাচন কমিশনের সাবেক দুই কর্মচারী সাগর (৩৭)ও সত্যসুন্দর দে (৩৮)।

এদের মধ্যে জয়নাল চট্টগ্রামে বসে থানা নির্বাচন অফিসের সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরির প্রাথমিক কাজ করত। বর্তমানে বিআরটিএতে কর্মরত সাগর এক সময় এনআইডি সার্ভারে আপলোড করত। সেই সুবাদে দেশের সব উপজেলার এনআইডি আপলোডের পাসওয়ার্ড তার কাছে আছে বলে জানা গেছে।

এছাড়া এনআইডি সার্ভারে অনুপ্রবেশের দায়ে তাকে নির্বাচন কমিশন থেকে চাকরিচ্যুত সত্যসুন্দর এখনো বিভিন্ন উপজেলায় এনআইডির ডাটা এন্ট্রির কাজ করে চলেছে।

কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মহসীন বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য প্রতিটি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বানাতে এ চক্রটি ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা নিত। এর মধ্যে রোহিঙ্গাদের এনআইডির জন্য চট্টগ্রামে থেকে ছবি, আঙুলের ছাপসহ প্রয়োজনীয় সব কিছু ডাবলমুরিং থানা নির্বাচন অফিসের অফিস সহায়ক মো. জয়নাল আবেদীন সরবরাহ করত। এক্ষেত্রে সে ছুটির দিনে অফিস থেকে নিয়ে আসা ওয়েবক্যাম, ফিঙ্গার প্রিন্ট নেওয়ার যন্ত্র, স্ক্যানার, সিগনেচার প্যাড বাসায় ব্যবহার করত।

এছাড়া নিজের কাছে থাকা উপজেলার এনআইডি আপলোডের পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে নির্বাচন কমিশনের সেন্ট্রাল সার্ভারে ডাটা ইনপুট দিত সাগর। একই কায়দায় জয়নালের সরবরাহ করা তথ্যে নির্বাচন কমিশনের সেন্ট্রাল সার্ভারে প্রবেশ করে রোহিঙ্গাদের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরি হতো - বলেন (ওসি) মোহাম্মদ মহসীন।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) পাইয়ে দেয়ার এই চক্রের সঙ্গে আরও অনেকে জড়িত আছে বলে আশঙ্কা করছি। সাগর ও সত্যসুন্দরকে গ্রেফতার করা গেলে অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে।

পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে জয়নাল জানিয়েছে, এক বছরের বেশি সময় ধরে তিনি রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় নিবন্ধনের কাজ করছেন তিনি। অফিস সহকারী হলেও নির্বাচন কমিশনের লাইসেন্সধারী ল্যাপটপের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় নিবন্ধনের কাজ শুরু করে ২০১৮ সাল থেকে।

নির্বাচন অফিসের আরো অনেকে এই কাণ্ডে জড়িত আছেন। ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা বিনিময়ে প্রতিটি রোহিঙ্গাকে ভোটার করা হতো। দালাল আর নির্বাচন অফিসের বিভিন্নজনকে দেয়ার পর একজন রোহিঙ্গা ভোটার করার বিনিময়ে জয়নাল পেতেন সাতহাজার টাকা।

জয়নাল জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশনের উচ্চমান সহকারী আবুল খায়ের এই পথে আনেন। নজিবুল্লা নামে একজন দালাল আবুল খায়েরের মাধ্যমে তার কাছে রোহিঙ্গাদের নিয়ে আসতো। রোহিঙ্গাদের ভোটার করতে দালাল নজিবুল্লার কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিতো আবুল খায়ের। তার সাথে যুক্ত আছে কক্সবাজারের আরো কয়েক ব্যক্তি।

আবুল খায়ের ছাড়াও আঞ্চলিক নির্বাচন অফিসের মোজাম্মেল, মিরসরাই নির্বাচন অফিসের অফিস সহকারী আনোয়ার, পাঁচলাইশ থানা নির্বাচন অফিসের হোসাইন পাটোয়ারি টেকনিক্যাল সপোর্টার মোস্তফা ফারুক এসব কাজের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বলে দাবি করেছে জয়নাল।

এদিকে রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) পাইয়ে দেয়ার অভিযোগে গ্রেফতার ডাবলমুরিং থানা নির্বাচন অফিসের অফিস সহায়ক মো. জয়নাল আবেদীনের তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। বুধবার দুপুরে চট্টগ্রামের একটি আদালত এ আদেশ দেন বলে জাগো নিউজকে নিশ্চিত করেছেন নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (প্রসিকিউশন) মো. কামরুজ্জামান।

এর আগে সোমবার (১৬ সেপ্টেম্বর)  রাতে চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন অফিসের এক কর্মচারীসহ পাঁচজনকে আসামি করে চট্টগ্রামের কোতোয়ালী থানায় মামলা করা হয়। নগরের ডাবলমুরিং থানা নির্বাচন অফিসের কর্মকর্তা পল্লবী চাকমা বাদী মামলাটি করেন।


সাবস্ক্রাইব ইউটিউব চ্যানেল