গল্প নয় সত্যি, ঋণের দায়ে ছেলে বিক্রি !

গল্প নয় সত্যি, ঋণের দায়ে ছেলে বিক্রি !

 বিশেষ সংবাদদাতা
  ২০১৯-১০-০৩: ১২:৩০ পিএম

ঘটনার শেষ চিত্রনাট্য শুধু সিনেমাতেই এভাবে লেখা হয়। এক সন্তানের জন্য কাঁদছেন দুই মা। একজন কাঁদছেন হারানো সন্তান ফিরে পেয়ে; অপরজন পাওয়া সন্তান হারিয়ে।তবে দুজনের প্রতি দুজনের কোনো কোনো অভিযোগ নেই। পুরো ঘটনাটি আবারো চোখে আঙ্গুল দিয়ে বোঝালো রক্তচোষা ক্ষুদ্র ঋণের বাস্তবতা।

স্থানীয় একটি এনজিও থেকে ৫০ হাজার টাকা ক্ষুদ্র ঋণ নিয়েছিলেন শ্রমিক এহেছানুল্লাহ(৪৫)। নুন আনতে পানতা ফুরোয় জীবনে প্রতি সপ্তাহে হাজার বারশ কিস্তির টাকা কোনো ভাবেই পরিশোধ করতে পারছিলো না। এর মাঝেই এনজিও কর্মকর্তারা তাকে টাকা পরিশোধের আল্টিমেটাম দিচ্ছিলো বারবার। সংসারেও অশান্তি চলছিলো এই ঋণের দায় নিয়ে।

ঋণ পরিশোধের চাপের মাঝেই এহেছানুল্লাহ পান ৫২ হাজার টাকার লোভনীয় প্রস্তাব।সন্তানহীন এক নারীকে ছেলে শিশু এনে দিতে পারলেই মিলবে এই টাকা।ঋণ থেকে মুক্তি পেতে নিজের বিবেক-বুদ্ধি হারিয়ে এই কটা টাকার জন্য নিজের সন্তানকে বিক্রি করে দেন জন্মদাতা পিতা।

সন্তানকে বিক্রি করেই ক্ষান্ত হননি ঋণগ্রস্থ এহেছানুল্লাহ। সঙ্গে সঙ্গে সাজান ছেলে নিখোঁজের নিঠুর নাটক। কখনো সন্তানের জন্য নিজের বউকে পাঠিয়েছেন বৈদ্য বাড়িতে। কখনো কখনো অভিনয়ের ছলে সন্তানের জন্য ফেলেছেন চোখের পানি। ওঝার তাবিজ দোয়ায় সন্তানের খোঁজ মেলে এই আশাতেই মা দৌঁড়ঝাঁপ করেছেন এখান থেকে ওখানে। এভাবেই কেটে গেছে টানা তিনমাস। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার সমাপ্তি ঘটেছে গতকাল চট্টগ্রামের রাউজান থানায়। তিনমাস পর রাব্বি ফিরে গেছে তার মায়ের কোলে।

বুধবার (০২ অক্টোবর) দুপুরে যখন সাত বছরের শিশু সন্তান রাব্বিকে যখন তার মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেওয়া হয় তখন সেখানে সৃষ্টি হয়েছিলো এক আবেগঘন পরিবেশের। এক সন্তানের জন্য আনন্দ আর অশ্রুতে ছলছল করছিলো দুই মায়ের চারচোখ। 

এহেছানুল্লাহর বাড়ি কুমিল্লা জেলার লাঙ্গলকোট থানার ভাঙ্গুরা ইউনিয়নে। তিনি স্থানীয় হাজী আবদুল মতিনের ছেলে।

রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অফিসার ইনচার্জ কেফায়েত উল্লাহ জানান, কুমিল্লায় এহেছানুল্লাহর স্ত্রী-সন্তান থাকলেও গত আট বছর আগে তথ্য গোপন করে কক্সবাজারের মহেশখালী থেকে আরও একটি বিয়ে করেন তিনি। ছোট স্ত্রী নাছিমা আকতার কক্সবাজারের মহেশখালীর শাপলাপুর ইউনিয়নের মৃত বদিউল আলমের কন্যা। তার এ সংসারে আছে রাব্বি ও এক কন্যা সন্তান।

বেশ কয়েক বছর ধরে এহেছানুল্লাহ রাউজানের কচুখাইন গ্রামের জাকির হোসেনের বাড়িতে কামলা হিসাবে কাজ করতেন। সেই পরিচয়ের সূত্র ধরে জাকির হোসেন তার বউয়ের বড় বোন বাচু আকতারের জন্য একটি ছেলে সন্তান কেনার আগ্রহ দেখালে টাকার লোভে পড়ে এহেছানুল্লাহ। তিন মাস আগে চট্টগ্রাম শহরে বেড়ানোর কথা বলে মহেশখালী থেকে স্ত্রী নাছিমাসহ দুই সন্তানকে নিয়ে চট্টগ্রামের একটি আবাসিক হোটেলে উঠেন এহেছান।

ওই দিন সকালে হোটেল থেকে ছেলে রাব্বিকে নিয়ে নগরেরর দিদার মার্কেট এলাকায় যায় সে। সেখানে জাকির হোসেনের শালিকা বাছু আকতারের কাছে ৫২ হাজার টাকার বিনিময়ে ছেলে রাব্বিকে বিক্রি করে দিয়ে হোটেলে ফিরে যান এহেছান। সেখানে স্ত্রীকে কান্নাকাটি করে বলেন তার ছেলে হারিয়ে গেছে।

এ কথা শুনে ছেলের মা নাছিমা বিলাপ করে কান্না জুড়ে দিলে সুচতুর এহেছানুল্লাহ তড়িঘড়ি করে মাইক ভাড়া নিয়ে ছেলের সন্ধানে চকবাজার বাদুরতলা এলাকায় মাইকিংও করেন।পরে স্ত্রী ও ছোট কন্যা সন্তানকে নিয়ে মহেশখালীতে চলে যান।

সেখানেও সে স্ত্রীকে নিয়ে ছেলের সন্ধানে কিছু টাকা খরচ করে বৈদ্য ওঝার কাছে গিয়ে। সর্বশেষ স্ত্রীকে শান্তনা দিয়ে এহেছানুল্লাহ কর্মস্থলে যাওয়ার কথা বলে মহেশখালী থেকে কক্সবাজারে গিয়ে সেখানে চাকরি নেন।

ওসি জানান, এর মাঝে দেখতে দেখতে কেটে যায় তিন মাস। একদিন ছেলেহারা মা নাছিমার মাথায় আসে স্বামীর পূর্বের কর্মস্থল রাউজানের কচুখাইন গ্রামের জাকিরের সঙ্গে যোগাযোগের আইডিয়া। যেই ভাবা সেই কাজ, তিনি ঘর থেকে খুঁজে নেন স্বামীর দেয়া সেই সময়ের জাকিরের মোবাইল ফোন নম্বর। এদিকে ঘটনাক্রমে ওই ফোন নম্বরটি ছিল জাকিরের শালিকা প্রবাসী মোরশেদ খানের স্ত্রী বাছু আকতারের।

নম্বরের সূত্র ধরে তার স্বামীর খোঁজ নেয়ার অজুহাতে বাছু আকতারের সাথে ফোনে কথা বলা শুরু করেন মা নাছিমা। কথার ফাঁকে নিজের ছেলে রাব্বি নিখোঁজ হওয়ার সংবাদটি বাছু আকতারকে জানালে বাছু আকতার তাকে উল্টো জানান রাব্বি নামের এক শিশুকে এহেছানুল্লাহ এনে তাদের কাছে বিক্রি করেছেন।

ওসি কেফায়েত উল্লাহ বলেন,রাব্বি খোঁজ পেয়েই মা নাছিমাছেলেকে ফিরে যেতে মহেশখালীর জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে সেখানকার থানায় ছুটে যায়। স্থানীয়রা কৌশলে এহেছানুল্লাহকে থানায় ফোনে ডেকে আনে। পরে থানার পরামর্শে নাছিমাসহ তার আত্মীয়-স্বজনরা একজন গ্রাম পুলিশকে সাথে নিয়ে রাউজান থানায় আমার কাছে আসে। রাউজান পুলিশের একটি টিম ছেলেটিকে উদ্ধারে প্রথমে কচুখাইন গ্রামে যায়। সেখান থেকে কচুখাইনে এহেছানুল্লাহর সেই বাড়ির মালিক জাকির হোসেনকে আটক করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল সকালে নগরের দিদার মার্কেট এলাকার বাছু আকতারের ঘর থেকে রাব্বিকে উদ্ধার করে পুলিশ।

পুলিশের কাছ থেকে পুরো ঘটনা জেনে রাব্বির নতুন মা বাছু আকতার নিজে রাউজান থানায় উপস্থিত হয়ে রাব্বিকে তারা মা নাছিমার কোলে তুলে দেন। এসময় থানা চত্বরে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।সম্প্রতি রাব্বির জন্য কেনা নতুন কাপড়চোপড়-খেলনাসহ সব কিছু তার মায়ের হাতে দেন বাছু আকতার। এমনকি ছেলের বিনিময়ে দেয়া ৫২ হাজার টাকার দাবিও ছেড়ে দিয়েছেন তিনি,-বলেন ওসি কেফায়েতুল্লাহ।

এদিকে কোনো পক্ষ থেকে ঋণগ্রস্থ এহেছানুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ না দেয়ায় তাকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। ফিরে পাওয়া সন্তানকে নিয়ে গতকালই মহেশখালী ফিরে গেছেন মা নাছিমা ...

চট্টগ্রাম২৪ডটকম/আমম


সাবস্ক্রাইব ইউটিউব চ্যানেল