বিস্ফোরণ গ্যাস পাইপে নাকি সেপটিক ট্যাংকে?

বিস্ফোরণ গ্যাস পাইপে নাকি সেপটিক ট্যাংকে?

 বিশেষ সংবাদদাতা
  ২০১৯-১১-১৮: ০১:২০ পিএম

রবিবার পাথরঘাটার ‘বড়ুয়া ভবন’-এ বিস্ফোরণ ঘটনার পেরিয়ে গেছে ২৪ ঘণ্টার বেশী সময়। কিন্তু এখনও জানা যায়নি কি কারণে এমন ভয়াবহ বিস্ফোরণ। যে বিস্ফোরণে প্রাণ গেছে নারী ও শিশুসহ ৭জনের।  

দুর্ঘটনার পর রোববার (১৭ নভেম্বর) জেলা প্রশাসন, নগর পুলিশ, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন তিনটি আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করে। ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ফায়ার সার্ভিস, পিবিআই ও বিস্ফোরক অধিদফতর।

এসব সংস্থার মধ্যে একমাত্র কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন (কেজিসিএল) ছাড়া আর কেউ তাদের তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করতে পারেনি। তবে ঘটনা সম্পর্কে নিজ নিজ মতামত দিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। দুর্ঘটনা নিয়ে তাদের সে মতামত ছিল পরস্পরবিরোধী। এতে দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে ‘ধূম্রজাল’ সৃষ্টি হয়েছে।

বিস্ফোরণের পরই কেজিডিসিএলর ব্যবস্থাপনা পরিচালক চার সদস্যের প্রাথমিক তদন্ত কমিটি গঠন করেন। দুপুরে কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন; সন্ধ্যায় জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সচিব, পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান, পরিচালক (অপারেশন) এবং কেজিডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়।

ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিল) তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে বিস্ফোরণের ঘটনায় ‘গ্যাসলাইনে কোনো লিকেজ পাওয়া যায়নি’ বলে রিপোর্ট দিয়েছে।

তদন্ত কমিটির প্রধান ও কেজিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (ইঞ্জিনিয়ারিং ও সার্ভিসেস) প্রকৌশলী সারোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমাদের তদন্তে গ্যাসের লাইনে কোনো লিকেজ পাইনি। গ্যাসের লাইন এবং রাইজার অক্ষত পাওয়া গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত বাসার রান্নাঘরে চুলার সঙ্গে সংযোগ লাইনও অক্ষত পাওয়া গেছে। রান্নাঘরে গ্যাস জমে বিস্ফোরণ হলে রান্নাঘর ক্ষতিগ্রস্ত হতো। কিন্তু সেটা অক্ষত আছে। রান্নাঘরের পাশে আরেকটি কক্ষে বিস্ফোরণ হয়েছে, যার নিচে সেফটি ট্যাংক আছে। এতে আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে, গ্যাসের লাইন থেকে বিস্ফোরণ হয়নি।’

তবে ঘটনার পরপরই নগর পুলিশ কর্মকর্তা শাহ্ মোহাম্মদ আব্দুর রউফ জানিয়েছিলেন, ‘সকালের রান্না বসাতে গিয়ে গ্যাসলাইনের রাইজার বিস্ফোরিত হয়ে এ ঘটনা ঘটেছে।’ তিনি বলেন, ‘বিস্ফোরণে আহতদের মধ্যে ওই ঘরের মেয়ে অর্পিতা নাথের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, তার পরিবারে তারা তিন সদস্য। সকালে দুর্ঘটনার সময় বাকি দুজন বাইরে ছিল। ৯টার দিকে সকালের রান্না বসাতে গিয়ে গ্যাসের চুলা জ্বালাতে গিয়ে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।’

বিস্ফোরণে পুড়ে যাওয়া সেই অর্পিতা নাথকে ঢাকা বার্ন ইউনিটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। চমেক হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অর্পিতার শরীরের প্রায় ৮০ শতাংশ পুড়ে গেছে।

ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক জসিম উদ্দিন বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্তে ভবনের গ্যাসলাইনের রাইজার বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে আমাদের মনে হয়েছে। এ কারণেই দেয়াল ধসের ঘটনা ঘটে। তিনি বলেন, ‘ভবনের ব্যবহারকারীরা ছিলেন একেবারেই অসচেতন। রাস্তার সঙ্গে লাগোয়া একটি রান্নাঘরের সঙ্গেই গ্যাসলাইনের রাইজারটি লাগানো ছিল। এমনকি রাইজারটিতে মরচে ধরে গিয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঘটনার পরপরই আমরা রাইজারটি উদ্ধার করে কোতোয়ালি থানার ওসি মহসিন সাহেবকে বুঝিয়ে দিয়েছি। এই ভবনটি ছিল অনেক পুরনো, ভবন মালিক এটি নির্মাণে কোনো নিয়মই মানেননি। তাই এখন ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।’

এর আগে দুপুরে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (বিপণন) আ ন ম সালেহ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেন, গ্যাসলাইনের ত্রুটি থেকে কোনো বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেনি। তিনি বলেন, গ্যাসলাইনের ত্রুটি থেকে কোনো বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলে চুলা অক্ষত থাকতে পারে না। এখানে চুলা ছিল অক্ষত। এছাড়া ওই বাসায় শুকাতে দেয়া কাপড়-চোপড়েও আগুন লাগেনি। গ্যাসলাইনের রাইজার অক্ষত পাওয়া গেছে।’

ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন বিস্ফোরক অধিদফতর চট্টগ্রামের পরিদর্শক তোফাজ্জল হোসেন। তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, গ্যাস বিস্ফোরণ থেকে ঘটনাটি ঘটেছে। রাইজার থেকে চুলা পর্যন্ত যে লাইনটি গেছে ওই লাইনে কোনো লিকেজ থাকতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ওই লিকেজ দিয়ে সারা রাত গ্যাস বের হয়ে ঘরবন্দি হয়ে পড়ে। পরে সকালে আগুন ধরাতে গেলে এই বিস্ফোরণ ঘটে থাকতে পারে। আমরা জানতে পেরেছি, আহত একজন ঘরে দিয়াশলাই জ্বালিয়েছেন। এতে আগুনের উৎস পেয়ে বিস্ফোরণ ঘটেছে।’

‘ঘরের মালিক রাইজারটি সংরক্ষণে অবহেলা দেখিয়েছেন। রাইজারটি প্লাস্টিক দিয়ে মোড়ানো থাকার কথা থাকলেও, সেটি ছিল উন্মুক্ত। এছাড়া সব গ্যাস বিস্ফোরণে আগুন ধরে যাবে এটি ঠিক নয়’ বলেন পরিদর্শক তোফাজ্জল হোসেন।
সোমবার তদন্তকাজে ঘটনাস্থলে যান জেলা প্রশাসন গঠিত ৫ সদস্যের তদন্ত ঠীম। সকাল ১১টা বেলা ১টা পর্যন্ত নানা পর্যবেক্ষণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে কথা বলেন কমিটির সদস্যরা। পরে বেলা সেয়া ১২ টায় সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন, কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এজেডএম শরীফ হোসেন। তিনি বলেন, তার কমিটি মাত্র কাজ শুরু করেছে, এখনও বলার মতো তেমন তথ্য তারা পাননি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, প্রাথমিক তদন্তে তারা একমত যে, গ্যাস থেকেই বিস্ফোরণ ঘটেছে। সেটা কি চূলার সরবরাহ লাইন, না বাড়ীর সেপটিক ট্যাংকের গ্যাস তা তদন্ত শেষেই বলা যাবে। 

নগর পরিকল্পনাবিদ শাহিনুল ইসলামসহ একটি টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রাথমিক তদন্তে বলেছে, ‘দুর্ঘটনাকবলিত ভবনটি সিডিএর বিধি অনুযায়ী হয়নি।’
সড়কের জায়গা দখল করে তৈরি করা হয়েছে সেপটিক ট্যাংক, তার পাশে কিচেন এবং গ্যাসের রাইজার রাখা ছিল। ফলে সেপটিক ট্যাংকে জমে থাকা গ্যাস ও গ্যাসলাইনের লিকেজ একসঙ্গে হয়ে বিকট শব্দে বিস্ফোরণের ঘটনাটি ঘটে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন সিডিএর এ পরিকল্পনাবিদ।
বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনা তদন্তে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) পক্ষ থেকেও একটি কমিটি করা হয়েছে। এ নিয়ে বিস্ফোরণের ঘটনা তদন্তে দুটি কমিটি গঠিত হয়েছে।

সিএমপির পক্ষ থেকে তিন সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। সিএমপির উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) এস এম মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে গঠিত কমিটিতে সদস্য হিসেবে আছেন বিশেষ শাখার অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (পুলিশ সুপার পদমর্যাদা) মঞ্জুর মোরশেদ এবং কোতোয়ালি জোনের সহকারী কমিশনার নোবেল চাকমা।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন, সিডিএ, সিটি কর্পোরেশন, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ প্রশাসনের যৌথ সমন্বয়ে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ কমিটিকে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্টেটকে।’


সাবস্ক্রাইব ইউটিউব চ্যানেল