১৯৭১ এর দু’বছর আগেই

১৯৭১ এর দু’বছর আগেই

 চট্টগ্রাম২৪ ডেস্ক
  ২০১৯-১২-১২: ০৬:০৬ পিএম

দেশে জাতীয় নির্বাচন সত্ত্বেও পাকিস্তানের জনসাধারণের নাটকীয় অভ্যন্তরীণ সঙ্কট সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত ছিল দিল্লি। এমনকি এমন ধারণাও পাওয়া যাচ্ছে যে পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনাবলী বিস্ফোরিত হওয়ার আগেই একটি হস্তক্ষেপমুখ্য কৌশলের কিছু উপাদান সক্রিয় ছিল। অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ দুটি পরস্পরবিরোধী ধারণা দেয়। একটি ধারণা পাওয়া যায় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র’-এর প্রধান ও ইন্দিরা গান্ধীর বিশ্বস্ত সহকর্মী আর এন কাওয়ের কাছ থেকে। তিনি আরো বেশি অশুভ পরিভাষায় সঙ্কটটি উপলব্ধি করতে পেরে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সঙ্কট থেকে ফায়দা হাসিলের জন্য সুবিধাজনক ভূকৌশলগত ব্যবস্থা অবলম্বনের সুপারিশ করেছিলেন। দ্বিতীয় ধারণাটি পাওয়া যায়, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কিছু অংশের মাধ্যমে। তারা সঙ্কটটিকে অনেক বেশি অনুকূল পরিভাষায় দেখে হস্তক্ষেপহীন অবস্থান গ্রহণের সুপারিশ করেছিল। মজার ব্যাপার হলো, ১৯৬৯ সালের দিকেও কাও যুক্তি দিচ্ছিলেন যে পূর্ব পাকিস্তান অনেক গভীর সঙ্কটে পড়ে আলাদা হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে এবং ভারতের ‘উচিত এর জন্য প্রস্তুত হওয়া।’ আর সঙ্কট যত সামনে আসছিল, তার মনোভাব তত প্রবল হচ্ছিল। ১৯৬৯ সালের এপ্রিলে একটি গোয়েন্দা ক্যাবলে তিনি সীমান্তজুড়ে আসন্ন সঙ্কটের পূর্বাভাস দেখতে পেয়েছিলেন:

সিআইএর সামরিক মানচিত্র: যেভাবে বাংলাদেশে অভিযান চালাতে পারে ভারতকর্তৃপক্ষ পূর্ব পাকিস্তানে ইতোমধ্যেই ব্যাপক শক্তিশালী হয়ে ওঠা আন্দোলন দমনের জন্য সেনাবাহিনী ও অন্যান্য আধাসামরিক শক্তি বড় মাত্রায় ব্যবহার করতে পারে। শক্তিপ্রয়োগের ফলে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে তাতে করে ইস্ট বেঙ্গল রাইফেলসের (বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত, যা সাম্প্রতিক পূর্ব পাকিস্তান ষড়যন্ত্র মামলায় দেখা গেছে) সমর্থন পেয়ে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, এমনকি স্বাধীনতাও ঘোষণা করতে পারে… যদিও এর সম্ভাবনা ঠিক এখনই দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু প্রত্যাশা করা হচ্ছে যে ভারত সরকার এ ধরনের পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে একটি নীতি ঠিক করে নিয়ে বিকল্পগুলো খোলা রাখবে।

কাওয়ের সুযোগ গ্রহণের ইঙ্গিতটি ইন্দিরা গান্ধীর নিরাপত্তা কামনাকারী ভূমিকার সাথে খাপ খেয়ে গিয়েছিল। অন্য দিকে ভারতের পররাষ্ট্র দফতরের উচ্চতর পর্যায় অনেক বেশি রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছিল। সিনিয়র কর্মকর্তারা যুক্তি দেন যে পাকিস্তানের ঐক্যেই ভারতের স্বার্থ রয়েছে, আশা করা হচ্ছে যে আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক কণ্ঠে পরিণত হবে এবং এর ফলে ভারতের অনুকূলে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যাবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি ইসলামাবাদে নিযুক্ত ভারতের হাই কমিশনার কৃষ্ণা আচার্যের ১৯৭০ সালের ২ ডিসেম্বর দিল্লিতে পাঠানো ক্যাবল থেকে। পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ঠিক পরপরই এটি পাঠানো হয়েছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের প্রাধান্যপুষ্ট সরকারের বিরামহীন বৈরিতার প্রেক্ষাপটে আচার্য যুক্তি দিয়েছেন যে জাতীয় পরিষদে বাঙালিদের প্রাধান্যের মধ্যেই পাকিস্তানের প্রতি আমাদের নীতিগত উদ্দেশ্য অর্জন এবং পশ্চিম পাকিস্তানের কঠিন প্রতিরোধ থেকে উত্তরণের একমাত্র আশা নিহিত রয়েছে। তিনি বলেন, আর এই আশা বাস্তবে পরিণত হওয়ার জন্য পূর্ব পাকিস্তানসহ পাকিস্তান অখণ্ড থাকা প্রয়োজন। এতে করে পূর্ব পাকিস্তানি নেতাদের মাধ্যমে আমাদের নীতিগত উদ্দেশ্য হাসিল করা যাবে।

ওই দূত কেবল উদার বাঙালিদের প্রভাবে সংস্কারের মাধ্যমে পাকিস্তানের ঐক্যকে ভারতের জন্য কল্যাণকরই দেখেনি, সেইসাথে স্বাধীন বাংলাদেশের মারাত্মক বিপদ ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন। তার মতে, পশ্চিমবঙ্গের লাগোয়া হওয়ায় এবং ঐক্যবদ্ধ বাঙলা চীনপন্থী নক্সালিদের প্রভাবে আসার আশঙ্কা রয়েছে। আচার্য হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন যে ভারতের কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা সমস্যা আরো বেড়ে যাবে পাকিস্তান ভেঙে গেলে। পররাষ্ট্রসচিব টি এন কাউলও মনে করেছেন যে ভারতের উচিত হবে না পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতাকে উৎসাহিত করা। অবশ্য তিনি যোগ করেন যে এটি থামানো ভারতের হাতে নির্ভর করছে না। মূলধারার মিডিয়ার অংশবিশেষও হস্তক্ষেপমুক্ত নীতির পক্ষে ছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিক গিরিলাল জৈন বলেন, পাকিস্তানের ঐক্যে স্বার্থ থাকার ঘোষণা ও একে অপরের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করার দুই পরাশক্তিকে রাজি করার চেষ্টা হতে পারে সর্বোত্তম নির্দেশিকা এবং নেহরু এই নীতিই অনুসরণ করেছেন।

কাওয়ের কৌশলগত সক্রিয়তার বিপরীতে ভারতের পররাষ্ট্র দফতরের এই বিশ্বাস ছিল অনেক মন্থর ও রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি এবং তা নেহরুর সঙ্ঘাত এড়ানোর নীতির সাথে অনেক বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। পরস্পরবিরোধী এই দুই দৃষ্টিভঙ্গি আবার প্রতিফলিত হয় ১৯৭১ সালের ৬ জানুয়ারি। ওই দিন আন্তঃএজেন্সি সভায় উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র কর্মকর্তা ও র’ কর্মকর্তারা। কাও যুক্তি দেন যে বাঙালি জাতীয় আকাঙ্ক্ষার গভীর শেকড় রয়েছে এবং এটি এখন আর ফেরার জায়গায় নেই। তার মতে, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নজিরবিহীন সাফল্যের ফলে আওয়ামী লীগ বা পাকিস্তানি নেতাদের কেউই সম্ভবত অভিন্ন অবস্থানে আসতে পারবে না। আর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পাকিস্তানি রাজনীতিতে মৌলিক পরিবর্তন মেনে নেবে না। ফলে তারা পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করবে। কাও ১৯৬৯ সালের কথা উল্লেখ করে বলেন, পূর্ব বাঙলার বিচ্ছিন্নতার জন্য ভারতের উচিত হবে নিজেকে প্রস্তুত করা, দ্রুত সাফল্য লাভের জন্য এখন প্রয়োজন মুক্তি আন্দোলনকে সহায়তা প্রদান করার সামর্থ্য সৃষ্টি।

কাওয়ের এই মূল্যায়ন সমর্থন করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা অশোক রায়। তিনি বলেন, বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ভারতের স্বার্থকে এগিয়ে রাখবে। এই নীতিগত অবস্থান চ্যালেঞ্জ করেন আচার্য ও আরেক সিনিয়র কূটনীতিক এস কে ব্যানার্জি। তার যুক্তি ছিল যে পাকিস্তানি ব্যবস্থায় ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটি ব্যবস্থা তৈরী করে ফেলতে পারে। এ কারণে বিদ্যমান অবস্থা অটুট রাখাই হবে সবচেয়ে ভালো কাজ। এসব কর্মকর্তা মনে করছেন, ১৯৫০ সালে পূর্ব বাঙলার প্রথম সঙ্কটের পর নেহরু স্থিতিশীলতার দিকে নজর দিয়ে উত্তেজনা হ্রাসের নীতি গ্রহণ করেছিলেন। কাও ও রায়ের দৃষ্টিভঙ্গিই ইন্দিরা গান্ধীর বিশ্বাসের সাথে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।

১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসের মধ্যভাগে কাওয়ের ধারনা আরো জোরদার হয়, তার সহকর্মীদের মধ্যে বিষয়টি আরো জোরালো হয়। ১৪ জানুয়ারি এক মূল্যায়নে তিনি উল্লেখ করেন যে সামরিক বাহিনীর ‘কট্টরপন্থীরা,’ ‘সুবিধাপ্রাপ্ত আমলারা,’ ও ‘সামন্ত স্বার্থগুলো’ সম্ভবত প্রেসিডেন্ট ও সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধা দিতে পারে। অবশ্য বাঙালিরা এবং এমনকি পশ্চিম পাকিস্তানের কিছু অংশ এ ধরনের অপঃকৌশলের বিরোধিতা করতে পারে। কাও আরো বলেন, পাকিস্তান হয়তো জম্মু ও কাশ্মীরে আরো কিছু অনুপ্রবেশকারী প্রবেশ করিয়ে তাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে নজর সরিয়ে নিতে পারে। পি এন হাকসারও পাকিস্তানের ব্যাপারে অস্বস্তির কথা বলেন। আওয়ামী লীগের বিজয় পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা জটিল করে ফেলেছে এবং বাইরের হস্তক্ষেপের প্রলোভন সৃষ্টি করেছে। তিনি তিন বাহিনীকে করণীয় সম্পর্কে সুপারিশ প্রণয়ন করার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে পরামর্শ দেন যাতে ভারতীয়রা নিরাপত্তার অনুভূতি লাভ করে।

এদিকে ঘটনাপ্রবাহ কাওয়ের ধারণাও সঠিক বলে নিশ্চিত করে। মধ্য ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তান পিপলস পার্টির জুলফিকার আলী ভুট্টো নতুন সংবিধান গঠনে আওয়ামী লীগের সাথে আলোচনার সম্ভাবনা বাতিল করে দিয়ে ঘোষণা করেন যে তার দল নতুন জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেবে না। ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করেন। ষড়যন্ত্রের আভাস পেয়ে মুজিবুর রহমান শান্তিপূর্ণ অসহযোগিতা আন্দোলনের আহ্বান জানান। এতে পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে জনগণ উদ্দীপ্ত হয়। আর ইন্দিরা গান্ধী ২ মার্চ মন্ত্রী পরিষদ সচিব পি এন হাকসার, আর এন কাও, টি এন কাউল ও স্বরাষ্ট্রসচিবকে নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে ভারতের সহযোগিতার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব সম্পর্কে মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে বলেন। পাকিস্তান কি বিশেষ করে কাশ্মীরে প্রতিশোধ নিতে পারবে কিনা এবং চীনের কাছ থেকে কোনো সামরিক প্রতিক্রিয়া হবে কিনা তাও যাচাই করতে বলা হয় তাদের। র’-এর প্রধান তখন হাকসার ও প্রধানমন্ত্রীকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন যে পূর্ব বাঙলার স্বাধীনতা আন্দোলনে ভারতের উচিত হবে দ্রুত সহায়তা করা। তার মতে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী হয়তো সাময়িক সাফল্য পাবে, কিন্তু তাদের পক্ষে মুক্তি আন্দোলন পুরোপুরি দমন করা অসম্ভব হবে। তিনি বলেন, সংগ্রাম যত দীর্ঘস্থায়ী হবে ততই আন্দোলনের চরমপন্থী ও চীনপন্থী কমিউনিস্টদের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হবে। তিনি বলেন, এ কারণে আমাদের নিজেদের স্বার্থেই দ্রুত পর্যাপ্ত সহাযতা দেয়া উচিত আওয়ামী লীগ ও এর নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ ও নির্দেশনার আলোকে মুক্তি আন্দোলনের দ্রুত সাফল্য নিশ্চিত করার জন্য।

মার্চের মাঝামাঝি সময় সঙ্কটটি উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। ১৮ মার্চ ঢাকার র’-এর কাছ থেকে দিল্লি একটি ক্যাবল পায়, যাতে মুজিবুর রহমানের বার্তা ছিল। এতে ‘এই সঙ্কটজনক সময়ে বিশেষ সাহায্যের আবেদনের’ পুনরাবৃত্তি ছিল। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে শক্তি বৃদ্ধির আশঙ্কায় আওয়ামী লীগের এই নেতা পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের আগে ভারতীয় পরামর্শ কামনা করেন। টেলিগ্রামটিতে জোর দিয়ে বলা হয়, মুজিবের কাছে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। হাকসার দ্রুত র’-এর সুপারিশে সাড়া দিয়ে ইন্দিরা গান্ধীকে পরামর্শ দেন যে এখন পাকিস্তানের প্রতি বন্ধুত্ব দেখানোর সময় নয়। এ ধরনের প্রতিটি ইঙ্গিত ইয়াহিয়া খানকে আরো স্বস্তি এনে দেবে এবং মুজিবের অবস্থান কঠিন করে তুলবে।

সূত্র : সাউথ এশিয়ান মনিটর  


নিউজটি শেয়ার করুন

সাবস্ক্রাইব ইউটিউব চ্যানেল