ভারতকে কড়া বার্তা শেখ হাসিনার: আনন্দবাজারের প্রতিবেদন

ভারতকে কড়া বার্তা শেখ হাসিনার: আনন্দবাজারের প্রতিবেদন

 চট্টগ্রাম২৪ ডেস্ক
  ২০১৯-১২-১৪: ১০:২২ এএম

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের সাম্প্রতিক ভারত সফর বাতিল করা হয়েছে। বিজয় দিবস (১৬ ডিসেম্বর) এবং বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবসের (১৪ ডিসেম্বর) অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকাসহ অভ্যন্তরীণ ব্যস্ত সূচির কারণে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরটি বাতিল করা হয়েছে বলে ঢাকার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। অপরদিকে ভারতের নাগরিক সংশোধন বিলকে কেন্দ্র করে মেঘালয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সেখানকার সফরটি স্থগিত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তবে দুই মন্ত্রীর এ সফর বাতিলের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের মোদি সরকারকে কড়া বার্তা দিতে চেয়েছেন বলে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কলকাতার প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার পত্রিকা। শুক্রবার (১৩ ডিসেম্বর) সংবাদমাধ্যমটিতে ওই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নয়াদিল্লির বিমানে ওঠার কয়েক ঘণ্টা আগে আজ (শুক্রবার) সফর বাতিল করলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। ভারত ওশিয়ান সংলাপে যোগ দিতে তিন দিনের এই সফর বাতিলের কারণ হিসেবে তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশে বিজয় দিবস (১৬ ডিসেম্বর) এবং বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস (১৪ ডিসেম্বর) সামনে। অনুষ্ঠানগুলিতে উপস্থিত থাকতে হবে। তাই একই সময়ে ওশিয়ান সংলাপের তারিখ পড়ায় তার আসা হল না।

এদিকে শুক্রবার মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমার আমন্ত্রণে শিলংয়ে যাওয়ার কথা ছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের। রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরে ‘উপযুক্ত সময়ে’ মন্ত্রী এই সফরে যাবেন।

আনন্দবাজার বলছে, প্রশ্ন উঠেছে, যেসব অনুষ্ঠানের কারণ দেখিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর বাতিল করা হল, সেগুলি বহু বছর ধরে ওই দিনেই হয়! ওশিয়ান সংলাপের দিনও স্থির হয়েছে মাসখানেক আগে। তা হলে সম্মতি দিয়েও শেষ মুহূর্তে কেন বিমানে উঠলেন না মোমেন? 

কূটনৈতিক সূত্রের বক্তব্য দিয়ে সংবাদমাধ্যমটিতে বলা হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত সে দেশের (বাংলাদেশের) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। বুধবার রাতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাসিনার বাসভবনে দেখা করতে গিয়ে এই নির্দেশ নিয়ে ফিরেছেন। 

খবরে বলা হয়েছে, সম্প্রতি সংসদে (ভারতের) পাশ হওয়া নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলটি ঢাকার রাজনৈতিক এবং সামাজিক পরিসরে গভীর অসন্তোষ তৈরি করেছে। বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্তে তা স্পষ্ট হয়ে গেল। মোদী সরকারকে এতটা কড়া বার্তা দিতে সাম্প্রতিককালে দেখা যায়নি বলে মনে করছেন কূটনীতিকেরা। 

আনন্দবাজার পত্রিকা বলছে, আজ অবশ্য সাংবাদিক বৈঠক করে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবীশ কুমার বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর বাতিল করা এবং সিএবি পাশের বিষয়টিকে পৃথকভাবে দেখা উচিত। সংসদের দুই কক্ষে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বক্তৃতা উদ্ধৃত করে রবীশ এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, অমিত শাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ভারত সরকার মনে করে সামরিক শাসন এবং খালেদা জিয়ার সময়েই সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার ভূমিকার প্রশংসাই করেছেন শাহ। 

কিন্তু ঘটনার গতি থেকে স্পষ্ট যে বাংলাদেশের অসন্তোষ গভীরে। গতকাল রাতে সিএবি পাশ হওয়ার পর আব্দুল মোমেন তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছিলেন, ‘ভারতের নিজের দেশে অনেক সমস্যা রয়েছে। ওরা নিজেদের মধ্যে লড়াই করুক, তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না। বন্ধু দেশ হিসাবে আমরা আশা করছি ভারত এমন কিছু করবে না, যাতে বন্ধুত্ব নষ্ট হয়।’

তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের মতো খুব কম দেশই রয়েছে যেখানে এত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রয়েছে। উনি (অমিত শাহ) আমাদের দেশে কয়েক মাস থাকলেই দেখতে পাবেন, এখানকার সম্প্রীতি নজির হতে পারে।’

বাংলাদেশ সূত্রের বরাত দিয়ে আনন্দবাজারের খবরে বলা হয়েছে, বিল পাশের সময় যেভাবে বার বার পাকিস্তানের সঙ্গে একই বন্ধনীতে বাংলাদেশকে রেখে সংখ্যালঘু নিপীড়নের দিকটি তুলে ধরা হয়েছে, তা হাসিনা সরকারের জন্য বিড়ম্বনার।  

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আজ সফর বাতিল করার পরে সাংবাদিক বৈঠকে রবীশ বলেছেন, ‘ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ এবং মজবুত। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সফর বাতিল এবং নাগরিকত্ব বিল পাশ হওয়া, দু’টি আলাদা ঘটনা। নয়াদিল্লি না আসতে পারার কারণ হিসাবে সে দেশের বিদেশমন্ত্রী নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সেটিকেই মানা উচিত।’

পাশাপাশি রবীশ বাংলাদেশকে বার্তা দিতে চেয়ে বলেছেন, ‘সত্যি কথা বলতে কী, কিছু বিভ্রান্তি হচ্ছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে সাফ ব্যাখ্যা করেছেন যে, সংখ্যালঘুদের উপর ধর্মীয় উৎপীড়ন বর্তমান সরকারের সময় হয়নি। সে দেশে পূর্ববর্তী সরকার এবং সামরিক শাসনের সময় এটা হয়েছে। বরং বর্তমান হাসিনা সরকার সংখ্যালঘুদের স্বার্থরক্ষায় বেশ কিছু পদক্ষেপ করেছেন।’ 

ঢাকা সূত্রের বরাত দিয়ে আনন্দবাজার আরও বলছে, বঙ্গবন্ধু ও হাসিনার প্রশংসা করার পাশাপাশি অমিত শাহ এ কথাও বলেছেন, ‘একাত্তরের পরেও সে দেশে (বাংলাদেশের) ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপরে নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে।’

খবরে বলা হয়েছে, ঢাকা মনে করে, কার সময়ে কী ঘটেছে সেই কাদা বার বার ছোঁড়ায় সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে সার্বিকভাবে একটি বার্তা গিয়েছে। আওয়ামী লীগের কট্টর ইসলামি অংশকে ভারত-বিরোধিতার জিগির তোলায় উদ্বুদ্ধ করার পক্ষে তা যথেষ্ট। ভারত-বিদ্বেষী প্রচারের ইন্ধন জোগাতে শুরু করেছে বিএনপিও। 

আনন্দবাজার বলছে, গত অক্টোবরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যে কূটনৈতিক কর্মকর্তারা ভারত সফর করেছিলেন, তাঁদের মতে, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে মুসলিমদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের জনসাধারণের মনে। ঘরোয়া রাজনীতিতে তা শেখ হাসিনার পক্ষে অনুকূল নয়। আওয়ামী লীগের ইসলামপন্থী অংশ ভারত-বিরোধী প্রচার শুরু করলে ভারত-বাংলাদেশ কৌশলগত ও বাণিজ্যিক আদানপ্রদান বাধার মুখে পড়তে পারে বলে তাঁদের আশঙ্কা। মাঝখান থেকে চীনের প্রতি নির্ভরতা বাড়বে ঢাকার।


সাবস্ক্রাইব ইউটিউব চ্যানেল