করোনা পরবর্তী পৃথিবী কেমন হবে?

করোনা পরবর্তী পৃথিবী কেমন হবে?

 ফিচার ডেস্ক
  ২০২০-০৩-৩১: ০২:২৯ পিএম

বিশ্বব্যাপী থাবা বিস্তার মহামারি কোভিড ১৯ বা করোনা ভাইরাস। অতীতে আরও নানা মহামারী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে হানা দিলেও স্বল্প সময়ে এমন পরাক্রমশালী রূপ ধারণ করতে পারেনি। বিশ্লেষকরা এরি মধ্যে হুশিয়ার করে বলেছেন, এই করোনা তান্ডবের পর অন্য এক পৃথিবী দেখবে মানুষ! নানা জন নানাভাবে এর বিশ্লেষন করেছেন বা করছেন। দেশেল শীর্ষ স্থানীয় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ওয়েল গ্রুপের প্রধান নির্বাহী সৈয়দ নূরুল ইসলাম। ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে খবর এবং যোগাযোগ যার সারা দুনিয়ার সাথে। 
করোনা ঝড় এবং এর পরবর্তী দুনিয়ার পরিস্থিতি তিনি তার ফেসবুকে তুলে ধরেছেন। নূরুল ইসলাম নিজ ছেলের প্রশ্নের ছলে তুলে ধরেন আগামীর বিশ্বের চিত্র। তাঁর এই বিশ্লেষণ কতটুকু বাস্তব, তা বলে দেবে ভবিষ্যতই। 

 

বাবা, তুৃমি গতকাল জানতে চেয়েছিলে করোনা/ কোভিট ১৯ পরবর্তী পৃথিবীর রুপটা কেমন হবে?অামি কিছু বলতে পারিনি তখন।অাজ সারা রাত...

Posted by Syed Nurulislam on Monday, March 30, 2020

বাবা, 
তুৃমি গতকাল জানতে চেয়েছিলে করোনা/ কোভিট ১৯ পরবর্তী পৃথিবীর রুপটা কেমন হবে? আমি কিছু বলতে পারিনি তখন। আজ সারা রাত তোমার প্রশ্ন নিয়ে ভেবেছি। 
তুমি কিংবা আমি, আমাদের দুই জেনারেশন এর কেউ নিজের চোখে বিশ্ব যুদ্ধ ১ কিংবা ২ দেখিনি। দেখিনি যুদ্ধ পরবর্তী তখনকার বিশ্ব পরিস্থিতি। 

আজকে তুমি আমাকে যে প্রশ্ন করলে সেই একই প্রশ্ন হয়তো আমি আমার বাবা, ১৯৪২ যিনি তখনকার ভারতবর্ষে জাপানিদের সাথে যুদ্ধ করছিল, তাকেও করতাম,বাবা আমাদের ভবিষ্যৎ কি? যুদ্ধের পর আমাদের কি হবে? বাবা হয়ত বলতেন,কি আর হবে। জাপানিরা হেরে যাবে। বৃটিশরা আমাদের দুবেলা খাবার দিয়ে বাচিয়ে রাখবে।কারণ বাবা তখন তোমার বা তোমাদের মত করে আঙ্গুলের চাপে পৃথিবীর মানচিত্র দেখতে পেতনা। তার কাছে পৃথিবীটা ছিল সাদা মানুষের দয়ায় দু'বেলা খেয়েপড়ে বেচে থাকা হতদরিদ্র ভারত বর্ষের মানুষগুলো।

তোমার আঙ্গুলের চাপে দেখা আজকের পৃথিবীটার মানচিত্রটাই ভিন্ন। পূর্ব থেকে পশ্চিম আর উত্তর থেকে দক্ষিন, পুরা পৃথিবীটায় আজ একই সুতায় বাধা। পূর্বের উহান নামের একটি শহরে হানা দিয়ে কোভিট১৯ আজ পুরা পশ্চিমাদের মৃতপুরী বানিয়ে ছাড়ছে। আমাদের মত গরীবদেরও দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়ে আমাদের আশে পাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কভিট ১৯ পবিত্র কাবাকে মানবশুন্য করেছে। মসজিদুল হারামের দরজা আজ বন্ধ। নিউয়র্কের টাইমস্কয়ার আজ জনমানব শুন্য। রোম নিরব নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। লন্ডন ব্রিজের পাশে যে বাড়িতে তুমি থাকতে সেবাড়ির দরজা জানালা আজ বন্ধ। পুরো স্পেন জুড়ে কান্নার রোল। ভেনিস শহরের প্রমোদ তরীগুলু নিরবে দাড়িয়ে আছে। ইস্তাম্বুলের বিমানবন্দরে ছুটাছুটি একেবারেই নেই। হামবুর্গ পোর্ট থেকে কোন জাহাজ আর ছেড়ে যায়না। ব্রাসেলসের পাবগুলোতে আলো জ্বলেনা। প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের লিফ্টটা নড়েনা। এথেন্সের থিয়েটার হাউসগুলোর আলো নিভানো। আম্সটারডেমের শহরের খালে নৌকাগুলো খালি খালি ভাসছে। ভিয়েনার রিংস্ট্রাভের গাছের নিচে বসার অাসনগুলোতে বসে কেউ গঁতের কথা ভাবছেনা। তোমার মামা খালারা যে শহরে থাকে, নিউঅরলিন্সের ফ্রেন্চ কলনির সেই কাফে দ্যা মোন্ডের চেয়ারগুলো খালি। মিসিসিপি উপর দীর্ঘ সেই ব্রিজে এখন আর গাড়ির ভিড় নেই। 

আলো ঝলমল পৃথিবীর হটাৎ থেমে যাওয়া যে রুপ তুমি অাজ দেখছ এটা ঠিক যেন বিশ্ব যুদ্ধ-৩, যার ওপর নাম কভিড-১৯। এটা এতটাই শক্তিশালী যে, ঘরের ভেতরেও তোমাকে আমাকে আক্রমণ করতে পারে। অতীত যুদ্ধে তবুও ঘরে থাকার মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ছিল। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ বন্ধ দরজাতেও স্বস্তি দিচ্ছেনা। তবুও আমরা ঘরে থাকবো, তা না হলে আরও মারাত্মক ভাবে ছড়াবে এই ভাইরাস।

এই যুদ্ধ ১ম না ২য় বিশ্ব যুদ্ধের মত কোনো ফিজিক্যাল অবকাঠামো কিংবা সম্পদ নষ্ট করবেনা। কিন্তু এটা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করবে পুরা পৃথিবীর সামাজিক এবং ব্যাবসায়িক স্থাপনাগুলোকে।সমগ্র মানবজাতির অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেংগে চুরমার করে দেবে।সরকারগুলো ব্যর্থ হবে। খাদ্য দ্রব্য, স্বাস্থ্য সেবা, বড় বড় কর্পোরেট হাউজগুলো, এয়ার লাইনস , হোটেল ব্যবসা পুরাটাই  দেউলিয়া হয়ে যাবে, দেশের নাগরিকরা ভাবতে শুরু করবে, তাদের সরকার তাদের কে প্রটেক্ট করার প্রতিশ্রুতি রাখতে পারে নি। কোভিড-১৯ পরবর্তী পৃথিবীতে সরকারি প্রতিষ্ঠান গুলো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে ! নাগরিকত্ব এবং দেশপ্রেম নামক শব্দ গুলো বিলীন হয়ে যাবে ! নতুন করে কোনো পুঁজি হবেনা। পুরোনো পুঁজি শেষ হয়ে যাবে। ম্যানহাটনের আকাশচুম্বি দালানগুলো ফাকা হয়ে যাবে,লন্ডনের পাতাল ট্টেনে মানুষের কোলাহল বন্ধ হয়ে যাবে।টোকিওর বুলেট ট্রেনগুলো খালি বসে থাকবে।সাংহাই থেকে মাল ভর্তি জাহাজগুল চীন সাগরে দাড়িয়ে যাবে।অামাজান,অালীবাবার গতি থেমে যাবে। গুগল তার পথ হারাবে। চাঁদের দেশে পাড়ি দেওয়া মানুষগুলো আর ফিরে আসবেনা। অনলাইনে বসে রাত জেগে লেখা তোমাদের পোস্টগুলো ফেসবুক, টুইটার,ফেসটাইম,ইনস্ট্যাগ্রামের পাতায় আর দেখা যাবেনা। ক্লাশরুমে রেখে আসা তোমার ল্যাপটপটা আর খোঁজে পাবেনা। লন্ডনে রেখে আসা তোমার প্রেয়সীর চোখ মুখ লাল করা কান্না মাখা মলিন চেহেরাটা অনলাইনে আর ভেসে উঠবেনা।

বাবা,সব বদলে যাবে। অবশেষে , পূর্ব আকাশে এক নতুন সুর্য উদয় হবে। পৃথিবীর পুনর্জন্ম হবে। কোভিট ১৯ আঘাতে আমাদের প্রজন্ম হারিয়ে যাবে। তোমরা টিকে যাবে। আবার মসজিদুল হারামের দরজাগুলো তোমরা গিয়ে খুলে দেবে,ভিতরের আলোগুলো জ্বালিয়ে দেবে। কাবার গিলাপটা নতুন করে সাজিয়ে লাব্বাঈক আল্লাহুম্মা লাব্বাঈক,লাব্বাঈক লা' শারীকা লাব্বাঈক বলে কাবার চারিপাশ মুখরিত করে তুলবে।মসজিদে নববীতে আবারও তোমরা আলো জ্বালাবে, আস্সালামু অালাইকা ইয়া রাসুলুল্লাহ বলে চোখের জ্বলে বুক ভাসাবে, পৃথিবীর মসজিদগুলো অাবার ভরে যাবে তোমাদের ভিড়ে।

সাংহাই থেকে মালভর্তি জাহাজগুলো চট্টগ্রামে এসে তোমাদের খুঁজবে। টোকিওর বুলেট ট্রেনগুলো তোমাদের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকবে। লন্ডনের পাতাল ট্টেনে ছড়ে ছেড়ে আসা প্রিয়তমার মুখ খোঁজবে। ম্যানহাটমের আকাশছোয়া দালানগুলোর আলো আবার তোমরাই জ্বালাবে। রোমের সুন্দরী মেয়েগুলো তোমাদের অপেক্ষায় সময় কাটাবে।

আর  ঢাকার পথ হারা মানুষগুলোকে তোমরাই নতুন করে স্বপ্ন দেখাবে। নতুন কোন আইডি দিয়ে নতুন কোন সোসাল মিডিয়ার পেজ খুলবে। নতুন কোন রকেট বানিয়ে চাঁদের দেশে পা রেখে বলবে আমরা এখানেই ঘুরে বেড়াব। নতুন একটি পৃথিবী যেখানে থাকবেনা জাতীয়তাবাদের নামের অহংকার,থাকবেনা আমাদের রেখে যাওয়া রাজনীতির নামে শাসনের হাতিয়ার, থাকবেনা কোন প্রাচির, উত্তর দক্ষিণ ও পূর্ব পশ্চিমের সীমা রেখা। নতুন করে বাঁচতে শিখবে তোমারা,নতুন একটি পৃথিবীতে।


সাবস্ক্রাইব ইউটিউব চ্যানেল