মানবাধিকার নেতার অমানবিক কারবার, খাদ্যের নামে খাওয়াচ্ছেন ‘বিষ’!

মানবাধিকার নেতার অমানবিক কারবার, খাদ্যের নামে খাওয়াচ্ছেন ‘বিষ’!

 বিশেষ সংবাদদাতা
  ২০২০-১০-০৮: ০৯:০৪ এএম

“মেয়াদ উত্তির্ণের কারণে ইতোমধ্যেই ‘বিষে’ পরিনত হয়েছে ‘সাইট্রিক এসিড’ ও ‘নাইট্রিক এসিড’। খাদ্য পন্য তৈরীতে এমন ইন্ডাস্ট্রিয়াল কালার ব্যবহার করা হচ্ছিলো, সেগুলো পরীক্ষা করতে হাতে নেওয়ার পর তা পরিস্কার করতে তিনবার লাইফবয় হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে হাত ধোঁয়ার পরেও যাচ্ছিলো না। এমন সব মারাত্বক ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান দিয়েই শিশু খাদ্য চিপস, নুডলস ও কোমল পানীয় তৈরী করছে চট্টগ্রামের প্রতিষ্ঠান বিএসপি ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেড।”

খাদ্যের নামে বিষ খাওয়ানো এমন ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে র্যাব সদর দফতরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসু ও র্যাবের চট্টগ্রাম জোনের সহকারী পরিচালক এএসপি কাজী মো. তারেক আজিজের বর্ণনায়। সম্প্রতি চট্টগ্রামের কালুরঘাট বিসিক শিল্প এলাকায় বিএসপি ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডে এর কারখানায় অভিযান পরিচালনা করেন তারা।

জানাগেছে, খাদ্যের নামে বিষ খাওয়ানোর এই কারবারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অজিত কুমার দাশ। বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। এ অবস্থায় মানবাধিকার নেতার এমন অমানবিক কারবারে হতভাগ চট্টগ্রামের মানুষ।

অভিযানে গিয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দেখতে পান, কাঁচ, কাঁচা চামড়া ও প্লাস্টিক -এমন সব শিল্প পণ্য তৈরী ও সংরক্ষণে ব্যবহৃত ইন্ডাষ্ট্রিয়াল লবন ও রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হচ্ছে ‘চিপস্’ ও ‘লুডলস’ তৈরীতে। মেয়াদ উত্তির্ণের কারণে ইতোমধ্যেই ‘বিষে’ পরিনত হয়েছে এমন ‘সাইট্রিক এসিড’ ও ‘নাইট্রিক এসিড’ দিয়েই তৈরী হচ্ছে ‘বিএসপি ফুডস’ এর কোমল পানীয়। কারখানায় অনুমোদনহীন পণ্য উৎপাদন, মেয়াদ ছাড়া উপকরণ দিয়ে বিভিন্ন খাদ্যপণ্য বানানোর প্রমানও মিলেছে। শনিবার (৩ অক্টোবর) বিকেলে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বিসিক শিল্প এলাকায়এ অভিযান পরিচালিত হয়।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) চট্টগ্রাম২৪ডটকমের সঙ্গে আলাপকালে প্রতারণা ও দায়িত্বহীনতার ভয়াবহ এ বিবরণ তুলে ধরেছেন আইনশৃঙ্খলাবাহীনির দায়িত্বে থাকা এই দুই কর্তাব্যক্তি।

বিএসপি ফুডসের পরিবেশ জঘন্য :

এএসপি কাজী মো. তারেক আজিজ বলেন,‘বিএসপি ফুডসের পরিবেশ ছিল জঘন্য। অবস্থা ছিল ভয়াবহ। কর্মীদের ব্যক্তিগত পরিষ্কার পরিছন্নতাতো ছিলোই না। তাদের খাবার গুলোতে অনেক ধরনের পোকা মাকড় পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটির অনেকগুলো পণ্যের বিএসটিআই লাইসেন্স ছিল না।  বিএসপি ফুডস টেক্সটাইল কালার অর্থাৎ যেটা জামা কাপড়ে কালার হিসেবে ব্যবহার হয় সে গুলো খাদ্য পণ্য তৈরিতে ব্যবহার করছিল। এছাড়াও জুতার রঙ, কাঁচের জিনিসপত্র তৈরিতে ব্যবহৃত কেমিক্যাল তারা ব্যবহার করছিল খাদ্যপণ্য তৈরিতে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। এসময় বিপুল পরিমাণ এর মেয়াদউত্তীর্ণ পণ্য পাওয়া গিয়েছিল ওই কারখানাটিতে।’

বিষ খাওয়াচ্ছে বিএসপি ফুডস :

র্যাব হেডকোর্য়াটারের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসু বলেন, ‘বিএসপি ফুটের অবস্থা মারাত্বক খারাপ ছিলো। পোড়া তেল এতটাই কালো হয়ে গেছে যে, এসব যদি মবিলের মত করে গাড়িতে ব্যবহার করা হয়, তাহলে গাড়িও নষ্ট হয়ে যাবে। স্বাভাবিক ভাবেই অনুমান করুন এসব আমাদের লিভারে কি ক্ষতি করবে। আসলে মূলত এমন সব খাদ্য উপাদান থেকেই ক্যান্সারের মত রোগের জন্ম হয়।’

ভয়াবহ তথ্য দিয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জানান, বিএসপি ফুডস বিএসটিআই এর লাইসেন্স ছাড়াই অনেক খাদ্যপন্য তৈরী করছিলো। অভিযানে বিএসপির গুদামে মিলেছে এসমসব সাইট্রিক এসিড ও নাইট্রিক অ্যাসিড; যেসবের মেয়াদ ফুরিয়েছে ২০১৭ সালে !

পলাশ কুমার বসু বলেন, ‘যে কোনো রাসায়নিকের মেয়াদউত্তির্ণ হয়ে গেলে তা স্বাভাবিক ভাবেই বিষে পরিনত হয়। অথচ এসব ‘বিষ’ বিএসপি ফুডস তাদের খাদ্য পন্য তৈরীতে ব্যবহার করছিলো।’

খাবারের রং মেহেদির চেয়ে গাঢ় !

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটি শুধু মেয়াদহীন সাইট্রিক এসিড ও নাইট্রিক অ্যাসিড তৈরী করছিলো না। খাদ্য পন্য তৈরীতে এমন ইন্ডাস্ট্রিয়াল কালার ব্যবহার করছে,  সেগুলো পরীক্ষা করতে গিয়ে আমি দেখলাম তিনবার লাইফবয় হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে হাত ধোঁয়ার পরেও ওগুলো যাচ্ছে না, অনেকটা মেহেদী কালার। আমি তাদেরকে বললাম, “মেহেদী হিসেবে ব্যবহার করলে কেমন হয়”?

তিনি বলেন, ‘গুড পোর্ট্রেট কালার হালকা পানিতে ধুলে উঠে যায়, কিন্তু বিএসপি ফুডস তাদের টাইগার নামে শরবতের মিক্সারসহ কোমল পানীয় তৈরিতে যেসব কালার ব্যবহার করছিল সেগুলো কোনো ভাবেই মানুষের খাবার উপযোগী নয়।’

‘আমি তাদের বললাম, “ওষুধ যদি তার মেয়াদ শেষ হয়ে যায় তাহলে সেটি সরাসরি বিষে কনভার্ট হয়ে যায়, তেমনি এসব এসিড ও রং এর মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে সেসব তো আপনি খাদ্যের ব্যবহার করতে পারেন না। এই যে দেখেন খাওয়ারের কারণে আমাদের ক্যান্সার হচ্ছে, বিভিন্ন ধরনের অসুখ-বিসুখ,কিডনির সমস্যা সব কিছুর মূল কারণ এই ধরনের খাবার।”

অভিযানে নিজের দেখা দৃশ্যের বর্ণণা দিতে গিয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসু বলেন,‘আমরা দেখি বিএসপি ফুডস এর নিচে ফ্লোরেই পড়ে আছে টোস্ট বিস্কিট, কাটা নুডুলস, পাশে দেয়ালে ময়লার আস্তরণ।  এভাবেই ফেলে রাখা হয়েছে খাদ্যপণ্য।’

ওই দিন বিএসপি ফুডস ছাড়ও কালুরঘাট শিল্প এলাকার মেরিডিয়ান ফুডস এর কার খানাতেও অভিযান চালিয়েছিলো ভ্রাম্যমান আদালত।

মেয়াদোত্তীর্ণ কাঁচামালে তৈরী হয় মেরিডিয়ানের নুডুলস ও  চিপস :

অভিযানে যাওয়া র্যাবের চট্টগ্রাম জোনের সহকারী পরিচালক এএসপি কাজী মো. তারেক আজিজ বলেন, ‘মেরিডিয়ান ফুডস লিমিটেডের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো তারা খাদ্য পণ্য তৈরীতে ইন্ডাস্ট্রিয়াল সল্ট (লবন) ব্যবহার করছিলো। অর্থাৎ যেটা কাঁচ, কাঁচা চামড়া ও প্লাস্টিক পণ্য তৈরি ও গো খাদ্যে ব্যবহার করা হয়,  ওই লবনই মেরিডিয়ানের নুডুলস ও  চিপস খাদ্য পণ্য তৈরিতে ব্যবহার করছিল। কারখানার পরিবেশ ছিলো একেবারেই অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন। শ্রমিকদের ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিছন্নতা বলতে কিছু ছিল না।’

তিনি জানান, অভিযানে মেয়াদোত্তীর্ণ প্রায় ৫ হাজার কেজি নুডুলস জব্দ করা হয়। যা তারা পরবর্তীতে বাজারজাতকরণ করার জন্যে রেখে দেওয়া হয়েছিলো। এছাড়া এসব পন্য তৈরীতে ব্যবহার করা কাঁচামাল গুলোর কোনোটারই মেয়াদ ছিলোনা।

র্যাব হেডকোর্য়াটারের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসু বলেন, ‘মেরিডিয়ান ফুডস একটি একটা ব্রান্ড। সারাদেশের মানুষ এটি গ্রহণ করে থাকে। এইযে পন্য তৈরীর যে কাঁচামাল, সেগুলোতেই যদি ভেজাল থাকে, তাহলে ভোক্তারা ভালো পন্য পাবেন এটা তারা কিভাবে নিশ্চিত করবেন?’

মেরিডিয়ানের গুদাম থেকে বিপুল পরিমান মেয়াদোত্তীর্ণ কাঁচামাল জব্দের বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা যখন তাদের স্টেরেজ হাউজে প্রবেশ করি, তখন মেরেডিয়ানের জেনারেল ম্যানেজার,প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ার,  ফুড প্রডিউসার, স্টোর কিপার সবাই ছিলেন। তাঁদের উপস্তিতিতেই আমরা সেখানে মেয়াদ উত্তীর্ণ পণ্য ব্যবহার ও সংরক্ষণের প্রমাণ পাই। মেয়াদ উত্তীর্ণ পণ্যের পরিমাণ এমন যে, দেখা গেছে পচে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। এমনকি তারা বলতেও পারে না আসলে তারা কখন এগুলো সংরক্ষন করেছিলেন।’

এসময় মেরিডিয়ানের প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে নিজের কথোপকথনের বিবরণ তুলে ধরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসু বলেন, ‘যিনি প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ার আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম এই পঁচা জিনিশ গুলো স্টোর রুমে কেন? তখন উনি বললেন, ‘আমি এটা ঠিক বলতে পারব না স্টোরম্যান বলতে পারবে।’

আমি বললাম ‘স্টোরম্যান তো জানবে স্টোরে কি কি আছে এসব পণ্য কী কী পারপাসে ব্যবহার হবে সেসব জানার কথা না। স্টোর ম্যানতো কোয়ান্টিটি নিয়ে কাজ করবে সে কোয়ালিটি নিয়ে কাজ করবে কেন? এটাতো ফুড ইঞ্জিনিয়ারের কাজ!

নির্বাহী মেজিস্ট্রেট বলেন, ‘স্টোরেজ গোডাউনে ১৮ সেন্টিগ্রেট তাপমাত্রায় যেখানে বিভিন্ন পণ্য সংরক্ষণ করা হয় সেখানে গিয়ে বিপুল পরিমাণ মেয়াদোত্তীর্ণ পন্য পেয়েছি। যেগুলো তারা বছরের পর বছর ব্যবহার করছিল এর মধ্যে কিছু ছিল ২০১৭ ও ১৮ সালের। কিন্তু সেগুলো তারা সংরক্ষণ করছিল খাদ্য পণ্য তৈরিতে ব্যবহারের জন্য। এমন কতগুলো পণ্য তৈরি করছিল যে গুলোর জন্য তারা কোন ধরনের বিএসটিআই এর অনুমোদন নেয়নি।’

তিনি বিশ্ময়সহকরে প্রশ্ন রেখে বলেন, তাঁরা দেশের জন্য একটা ব্রান্ড। সারাদেশের মানুষ তাদের উপর আস্থা রাখে, সে অবস্থায় তারা এভাবে উৎপাদন কাজ কিভাবে পরিচালনা করতে পারেন?  

তিনি জানান, এমনসব গুরুতর অভিযোগে মেরিডিয়ানকে বিএসটিআই আইনে পৃথকভাবে দুই লাখ টাকা ও বিএসপিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া নিরাপদ খাদ্য আইনে উভয় প্রতিষ্ঠানকে ২০ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। এসময় প্রায় ৫ মেট্রিক টন নুডলস ও ২ মেট্রিক টন ঘিসহ জব্দ আরও বিভিন্ন পণ্য ধ্বংস করা হয়।

ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসু বলেন, ‘আমরা জেনেছি এসব প্রতিষ্ঠানকে এর আগেও জনিমানা করা হয়েছে, কিন্তু তারা বদলায়নি। তাই এবার জরিমানার পরিমানে এমন একটি দাগ কাঁটতে চেষ্টা করেছি, যাতে তারা অবশ্যই পরিবর্তিত হতে বাধ্য হন। প্রতিষ্ঠান দুটিকে নিজেদের বদলে নিতে দুই মাস সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।’


নিউজটি শেয়ার করুন

সাবস্ক্রাইব ইউটিউব চ্যানেল