‘দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক নেতৃত্বে বাংলাদেশ’

‘দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক নেতৃত্বে বাংলাদেশ’

 নিজস্ব প্রতিবেদক
  ২০২০-১০-২৬: ০১:৪৫ পিএম

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস মহামারিতে যখন প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক পরাশক্তিগুলোর ধরাশায়ী অবস্থা, তখন বাংলাদেশের মতো একটি জনাকীর্ণ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে নাস্তানাবুদ হওয়া দেশের অর্থনীতি ক্রমেই এগিয়ে যাচ্ছে।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা পাওয়া দেশটি কীভাবে এই অর্থনৈতিক দৌড়ে নিজেদের এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সে ব্যাপারে একটি বিশ্লেষণ করেছেন সংবাদ এজেন্সি সিএনআই এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা আশফাক জামান। যা দ্য ডিপ্লোম্যাট ম্যাগাজিনে ২৩ অক্টোবর প্রকাশিত হয়। পাঠকদের জন্য ওই বিশ্লেষণের চুম্বক অংশ তুলে দেওয়া হলো।

সম্প্রতি দক্ষিণ এশিয়ায় একটি বিষয় নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে আর তা হলো মাথাপিছু জিডিপি'র হিসাবে বাংলাদেশ আঞ্চলিক অর্থনৈতিক পরাশক্তি ভারতকে টপকে গেছে। কিন্তু, মাত্র পাঁচ বছর আগের বাস্তবতাও ছিল ভিন্ন। সে সময় ভারতের মাথাপিছু জিডিপি বাংলাদেশের তুলনায় ২৫ শতাংশ এগিয়ে ছিল।

এখানে স্পষ্ট ব্যবধান গড়ে দিয়েছে দুই দেশের করোনা মোকাবিলায় নেওয়া পদক্ষেপসমূহ। ভারতকে এখন পর্যন্ত করোনা মোকাবিলায় হিমশিম খেতে হচ্ছে। ইতোমধ্যেই করোনায় বৈশ্বিক আক্রান্ত এবং মৃতের তালিকায় ভারত তিন নম্বরে উঠে এসেছে। সেখানে বাংলাদেশ তাদের তথ্যবহুল গণস্বাস্থ্য কার্যক্রম এবং ডিজিটাল অবকাঠামো ব্যবহার করে করোনাকালেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

তাই, বিশ্ব দরবারে এখন নতুন অর্থনৈতিক বিস্ময় তৈরি করেছে বাংলাদেশ। ধরে নেওয়া যায়, যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের পুরাতন অর্থনৈতিক মিত্র ভারতকে বাদ দিয়ে, আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের সঙ্গে আরও দৃঢ় অর্থনৈতিক সম্পর্কে সম্পর্কিত হতে যাচ্ছে।

একটি দেশের মুদ্রার তারল্য, রফতানি এবং শাসনব্যবস্থার বাইরেও অর্থনৈতিক শক্তিমত্তা প্রমাণের নতুন সূচক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জৈবনিরাপত্তা বিধানের সক্ষমতা। শুধুমাত্র জৈবনিরাপত্তাই অন্য সবগুলো সূচকের হিসাবকে বদলে দেওয়ার সামর্থ্য অর্জন করেছে।

এক্ষেত্রে, মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নই যে দেশটির আজকের এই অবস্থান তৈরি করেছে এমনটি নয় বরং ভারতের মতো একটি বৃহৎ অর্থনীতির দেশে করোনাকালে স্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক খাতে নজিরবিহীন নিয়ন্ত্রণহীনতা এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে।

মহামারির যথাযথ ব্যবস্থাপনা যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নয় তার প্রমাণ - চীন। এই করোনাকালেও চীনের জিডিপি বছরের প্রথম চার মাসের তুলনায় প্রায় পাঁচ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে, চীনের প্রসঙ্গটি একটু আলাদা। কারণ, নভেল করোনাভাইরাসের উৎপত্তিস্থল হিসেবে দেশটিকে মহামারি মোকাবিলায় অনেক কঠোর পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।

বিশ্বে মহামারিকে জয় করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ধরে রেখেছে এমন নজির আরও অনেক দেশই সৃষ্টি করবে। সেক্ষেত্রে, আপাতঃ দৃষ্টিতে ব্যর্থ দেশগুলোর উচিত হবে ওই দেশগুলোর কাছ থেকে শেখা - কীভাবে সবদিক ঠিক রেখে মহামারিকালেও অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়া যায়।

এদিকে, দক্ষিণ এশিয়ার এই অর্থনৈতিক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে যৌথভাবে দ্রুত ডিজিটাইজেশন এবং সামাজিক সক্ষমতা বাড়ানোর মধ্য দিয়ে। যে কারণে, ক্রমেই বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্ব বাজারে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।

একটু পেছনে তাকালে দেখা যায়, ব্রিটিশ কলোনি থেকে মুক্ত হওয়ার পর আরেক অলিখিত কলোনি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ভারত। ভারতের আধিপত্য এতোই বর্ধনশীল ছিল যে, এই অঞ্চলের দেশগুলোর পরিচয়ই হয়ে উঠেছিলে - ভারতীয় উপমহাদেশের দেশ।

কিন্তু, বর্তমানে সেই হিসাব পাল্টে যাচ্ছে। বিশেষ করে, বাংলাদেশে। পাকিস্তানকে আগেই পেছনে ফেলা বাংলাদেশ সম্প্রতি ভারতকেও টপকে গেছে। দেশে উন্নয়নমুখী সমাজ এবং অর্থনীতি তৈরি হয়েছে। এছাড়াও, বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে - বাংলাদেশ দক্ষ এবং প্রাজ্ঞ ভূমিকা নিয়েছে।

এখানে, মহামারির মধ্যে জিডিপি'র হিসাবে বাংলাদেশ ভারতকে টেক্কা দেওয়া কিন্তু একদিনের কোনো ঘটনা নয়। দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ তার উন্নয়নমুখী অর্থনীতি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। তার ফলাফল হিসেবে দেশটি মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে অনেক আগেই। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে গেছে দেশটির সমাজ ব্যবস্থা। লৈঙ্গিক সমতা বিধান এবং নারীর ক্ষমতায়নে রোল মডেল হয়েছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি, ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার মাধ্যমে দেশটির সর্বক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণকে আরও উৎসাহিত করার পথ সুগম করা হয়েছে - যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোতে বিরল।

অন্যদিকে, বাংলাদেশকে সম্পূর্ণভাবে ডিজিটাইজেশনের আওতায় আনতে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে এটুআই নামের একটি সরকারি এজেন্সি কাজ করে যাচ্ছে। প্রযুক্তিভিত্তিক ক্ষুদ্র বা মাঝারি ধরনের ব্যবসায়িক উদ্যোগ ক্রমেই দেশটির আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ছে। শুধু তাই নয়, আউটসোর্সিং এর ক্ষেত্রে জাপান, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্বস্ত গন্তব্য হয়ে উঠছে বাংলাদেশ।

কৌশলনির্ভর কূটনীতিকে পুঁজি করে বাংলাদেশ একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক উন্নয়ন করে চলেছে, ব্রেক্সিট পরর্বতী বাস্তবতায় যুক্তরাজ্যও তাদের মিত্র জাপানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক নতুন করে ভেবে দেখছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প যুক্তরাজ্যভিত্তিক অনেক নতুন ক্রেতা পাচ্ছে।

সবশেষে বলা যায়, বিশ্বের অনেক দেশই স্বপ্ন দেখছে মহামারির পর তারা আবার আগের মতো অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় সামিল হবে। এক্ষেত্রে, ভুলে গেলে চলবে না দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনই কিন্তু আঞ্চলিক আধিপত্য অর্জন নয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি যেহেতু মহামারির ভেতরও ঈর্ষণীয় অবস্থনে রয়েছে, তাই, আগামী দিনের দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক নেতৃত্বে বাংলাদেশই থাকছে এ কথা বলা অত্যুক্তি হবে না।


নিউজটি শেয়ার করুন

সাবস্ক্রাইব ইউটিউব চ্যানেল