দুই ছিনতাইকারীর বন্ধুত্ব ও ভয়ংকর হয়ে উঠার গল্প ...

দুই ছিনতাইকারীর বন্ধুত্ব ও ভয়ংকর হয়ে উঠার গল্প ...

 বিশেষ সংবাদদাতা
  ২০২০-১১-১৮: ০৩:৩৪ পিএম

‘রাকিব একসময় চকবাজার এলাকার ছিঁচকে চোর ছিলো। প্যারেড মাঠে খেলতে আসা ছেলেদের মোবাইল চুরি করতো। তার বন্ধু নিপা মামা সুমনের সঙ্গে মিলে নগরিতে অনেক ছিনতাইকাণ্ড ঘটিয়েছে। বছর খানেক আগে নিপার মামা সুমন নগরে মুরাদপুরে এক দারোয়ানকে খুন করে জেলে যায়। এরপরই পরিচয় ঘটে রাকিব ও নিপার। দুজনে মিলে শুরু করে ছিনতাই'- কথা গুলো সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালী জোন) নোবেল চাকমার।

নোবেল চাকমা জানান, ‌‌পুলিশি অভিযানে গ্রেফতার রাকিব ও নিপা দুজন বন্ধু। ছিনতাইয়ের সূত্রেই তারা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হয়ে গত একবছর ধরে নগরের ভিন্ন এলাকায় ছিনতাই করে বেড়াচ্ছে। এদুজন নিজেদের প্রেমিক-প্রেমিকা পরিচয়ে সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া নেয়। শহরের বিভিন্ন রাস্তায় রাস্তায় ঘোরার সময় টার্গেট নির্ধারন করে নিপা। টার্গেট পেয়ে গেলে সিএনজি থেকে নেমে নিপা ভিকটিমকে নানা ভাবে প্রলুব্ধ করে অথবা আটকে রাখার চেষ্টা করে, এই ফাঁকে রাকিব ভিকটিমের কাছ থেকে মোবাইল ছিনিয়েছে নেওয়ার চেষ্টা করে। যদি ভিকটিম মোবাইল দিতে না চায়, তাহলে রাকিব ছুড়িকাঘাত করে মোবাইল ছিনিয়ে নেয়।

মঙ্গলবার রাত সোয়া আটটার দিকে তিন সহকর্মী নাছির, রাজু ও সেলিম চট্টগ্রাম নগরের জয় পাহাড়ের ভেতর দিয়ে কর্মস্থল থেকে বাসায় ফিরছিলেন। তারা তিনজন সার্সন রোড়ে সিজিএস স্কুলের কোনায় আসা মাত্রই, সিএনজি অটোরিকশা থেকে নেমে এক তরুনী সেলিমের পথ রোধ করে, অপরএক তরুণ তারা কিছু বুঝে উঠার আগেই সেলিমের বুকে, পেটে ও উরুতে ছোরা দিয়ে জঘম করে। একপর্যায়ে মারাত্বক জখম হওয়া সেলিমের মোবাইল ফোনটি নিয়ে আবারো সিএনজি যোগে পালিয়ে যায় ওই তরুণ-তরুনী।

শুধু এই একটি ঘটনা নয়, গত ষাট ঘন্টায় চট্টগ্রাম নগরে এমন অন্তত সাতটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে দুটি ঘটনায় মারাত্বক জখম হয়ে দুই ব্যক্তি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। দুটি ঘটনাতেই নগরের কোতোয়ালী থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগ পেয়ে মঙ্গলবার রাতভর অভিযান চালিয়ে নগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে ১৩ ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতার ছিনতাইকারীদের মধ্যে দুই নারী ও ৫ কিশোর অপরাধীও রয়েছে।

এদিকে কোতোয়ালী থানার রহমতগঞ্জ এলাকায় সংঘটিত একটি ছিনতাই ঘটনার সিসিটিভির ভিডিও ফুটেজে দেখাযায়, পূর্বে ঘটনার মতই একজোড়া তরুণ-তরুনী সিএনজি অটোরিকশা থেকে নেমে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন। মোবাইল হাতে এক পথচারি পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। হটাৎ ওই তরুনী পথচারিকেকে সামনে থেকে আগলে ধরতেই সঙ্গি যুবক ছোড়া দিয়ে লাগাতার আঘাত করতে থাকে। একপর্যায়ে মারাত্বক জখম যুবকের হাত থেকে মোবাইলটি ছিনিয়ে নিয়ে ওই তরুন-তরুনী প্রকাশ্যে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।

অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) পলাশ কান্তি নাথ বলেন, ‘স্থানীয়দের থেকে খবর পেয়ে আমরা ছুরিকাঘাতে আহত যুবককে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেই। পরে খোঁজ নিতে গিয়ে একটি সিসিটিভির ভিডিও ফুটেজ আমাদের হাতে আসে। যেখানে দেখা যাচ্ছে, একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে সিএনজি অটোরিকশা থেকে নেমে রাস্তা দিয়ে আসা অন্যমনস্ক একজন লোককে ধরলো, ধরার পরই তাকে ছুড়ি নিয়ে আঘাত করতে থাকে। তারপর তার হাত থেকে মোবাইল পরে গেলো। মোবাইল নিয়ে ওই নারী দৌরে পালিয়ে যাচ্ছে, রাস্তাঘাটে অনেক মানুষ কিন্তু কেউ বাধা দিচ্ছেনা।’

তিনি বলেন, ‘প্রথমে বিষয়টি দেখে আমাদের কাছে মনে হয় এটি কোনো মেয়ে ঘটিত ঘটনা। কিন্তু পরে বুঝতে পারি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ফাঁকি দিতে এটি ছিনতাইকারীদের একটি কৌশল। সেটার প্রেক্ষিতে আমরা যখন অপরাধিদের ধরতে অভিযান শুরু করি। অভিযানে গিয়ে প্রথমেই আমরা ভিকটিমের মোবাইলটি উদ্ধার করি। যার থেকে মোবাইল উদ্ধার হয় তাদের দেওয়া তথ্যে আমরা একটি গ্রুপকে ধরি যেখানে এক নারীসহ চার পুরুষ সদস্য আছে। আমরা ধারনা করি এরাই ওই ঘটনার সাথে জড়িত। কিন্তু তদন্ত এগুতে থাকলে আমরা নিজেদের ভুল বুঝতে পারি। অর্থাৎ অপরাধের মূল হোতারা তখনো অধরা।’

কোতোয়ালী থানার ওসি মোহাম্মদ মহসিন জানান, ‌‌গত ১৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় নগরের গনি বেকারি মোড়ে ছিনতাইয়ে শিকার হন অরবিন্দু দত্ত (৩৪) নামে এক ব্যাক্তি। এসময় ছিনতাইকারীরা অরবিন্দুকে মারাত্বক ভাবে ছুড়িকাঘাত করে গুরুতর আহত করে। গতকাল রাত আটটার দিকে নগরের চকবাজারের সার্সন রোড দিয়ে যাওয়ার সময় মো. সেলিম নামে আরো এক ব্যক্তি ছিনতাইয়ের শিকার হন। এ ঘটনাতেও ভিকটিমকে বুকে, পেটে ও উরুতে ছোড়া দিয়ে মারাত্বক জঘম করা হয়।

ওসি মোহাম্মদ মহসিন বলেন, ‌‘এ দুটি ঘটনাতেই আমাদের কাছে অভিযোগ দায়ের করা হলে ঘটনা তদন্তে নামে পুলিশ। তথ্য-প্রযক্তির সাহায্যে ছিনতাই হওয়া মোবাইল ক্রয়কারী সানাক্তের পর প্রথমে নগরের সিরাজউদ্দৌলা রোড থেকে রুবেল ও তার স্ত্রী ফারজানা বেগমকে এবং তাদের দলের আরো তিন সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। পরে আন্দরকিল্লা রাজাপুকুর লেইন থেকে পাঁচ কিশোর ছিনতাকারিকে গ্রেফতার করা হয়।’

ওসি বলেন, ‘এ দুটি গ্রুপকে গ্রেফতারের পরও গতকাল রাত আটটার দিকে নগরের চকবাজারের সার্সন রোডে ছিনতাইয়ের শিকার হন মো. সেলিম। এ ঘটনায় পুলিশকে কিছুটা বিচলিত করে তোলে,পরে আবারো তথ্য-প্রযক্তির সাহায্যে রাত নয়টার দিকে নগরের স্টেশন রোড থেকে ছিনতাইকারী রাকিব ও নিপাকে গ্রেফতার করা হয়।’


নিউজটি শেয়ার করুন

সাবস্ক্রাইব ইউটিউব চ্যানেল