লালদিঘীকে না-চিনলে চট্টগ্রামকে জানা যাবে না: সুজন

লালদিঘীকে না-চিনলে চট্টগ্রামকে জানা যাবে না: সুজন

 নিজস্ব প্রতিবেদক
  ২০২০-১১-২০: ০৮:০৯ পিএম

লালদিঘীকে না-চিনলে, না-জানলে চট্টগ্রামকে চেনা ও জানা যাবে না। লালদিঘীকে ঘিরেই চট্টগ্রামের ইতিহাস, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের নানান বর্ণিল অধ্যায় সুচিত হয় এবং অনেক বীরত্ব গাঁথার স্মৃতির হীরকখণ্ড এখনো ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে এসে চোখের মণিতে জ্বলজ্বল করে। তাই লালদিঘী শুধু এক টুকরো নৈ:সর্গিক ভূমি নয়, স্মৃতি, সত্তা ও অস্তিত্বের শিকড়। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন এসব মন্তব্য করেন। 

তিনি শুক্রবার (২০ নভেম্বর) সকালে লালদিঘীর চারপাশ ঘিরে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে গড়ে তোলা বাহারী ফুল ও বৃক্ষরাজির সজীব সবুজে শোভিত পার্কটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্তকরণ অনুষ্ঠানে এভাবেই এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে ধরেন। তিনি লালদিঘী ও তৎসংলগ্ন মাঠের ঐতিহাসিক গুরুত্ব উপস্থাপন করে বলেন, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অংশ নেয়া তরুণ ও যুবকদের শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি কল্পে আজ থেকে শতবর্ষ আগে আবদুল জব্বার বলী খেলার সূচনা করেন। একে ঘিরেই প্রতি বাংলাবর্ষের ১২ বৈশাখ লালদিঘীর বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে দেশের সর্ববৃহৎ বৈশাখী লোকখেলা হয়ে আসছে। এই লালদিঘীর পূর্বে চট্টগ্রাম, জেলা কারাগারে ব্রিটিশ রাজশক্তি অগ্নিযুগের বিপ্লবী মাস্টার দা সূর্যসেন ও তারকেশ্বর দস্তিদারকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে ছিল। 

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় রমনা ভাষা শহীদদের রক্তে রঞ্জিত হবার পর দিন লালদিঘী ময়দানে একুশের প্রথম কবিতা মাহবুবু উল আলম চৌধুরীর কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি’ পাঠ করেছিলেন চৌধুরী হারুনুর রশীদ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই লালদিঘীর মাঠে সর্বপ্রথম জনসভায় ৬ দফা ঘোষণা করেন। একাত্তরের অসহযোগের অগ্নিঝড়া দিনে অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমদের ‘এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম’ নাটক এই লালদিঘী মাঠে অভিনীত হয় এবং মৌলভী ছৈয়দ আহমদ ও এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে জয়বাংলা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর মার্চপাস্ট অনুষ্টিত হয়। এটাই ছিলো সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিমূলক মহড়া।

স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লালদিঘী মাঠে জনসভা করতে আসার পথে তাঁকে হত্যার প্রচেষ্টায় সামরিক স্বৈরশাসকের লেলিয়ে দেয়া পুলিশ বাহিনীর নির্বিচারে গুলিবর্ষণে লালদিঘীর অনতিদূরে শহীদ হন ২৬ জন। এ ধরণের অনেক বীরত্বগাঁথার ইতিহাস আছে লালদিঘীকে ঘিরে। তাই চট্টগ্রামের ইতিহাস, রাজনীতি-ধর্ম-সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও বিনোদনের ক্ষেত্রে লালদিঘীর সম্পৃক্ততা চিরকালীন ও সর্বজনীন তাই চট্টগ্রামকে চেনা ও জানার নাভিমূল এই লালদিঘী।

তিনি আরো বলেন, ১৯৩৯ সালে তৎকালীন কুলীন জমিদার নন্দনকাননের রাজ কুমার ঘোষ তাঁর নিজস্ব জায়গায় লালদিঘীর গোড়াপত্তন করেন এবং লালদিঘীর চারপাশে বাগান করেন।

পরবর্তীতে সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী রাজ কুমার ঘোষের পরিবার থেকে প্রতীকী মূল্যে লালদিঘী চসিকের মালিকানাধীন করেন এবং দিঘী ও পার্কের নানন্দিক রূপ দেন। তখন এটা হয়ে ওঠে নগরবাসীর প্রাত: ও বৈকালিক ভ্রমণের একটি অতুলনীয় উপাদান। তবে পরে এটা ধীরে ধীরে নান্দনিকতা হারিয়ে ফেলে এবং অসামাজিক কর্মকান্ডের জন্য এর পরিবেশ দুষিত হয়ে ওঠে। মহিউদ্দিন চৌধুরীর ইচ্ছা ছিলো এই লালদিঘীতে সাধারণ নাগরিকদের সন্তানদের নামমাত্র মূল্যে সাঁতার শেখার জন্য একটি স্যুইমিং পুল করা। তিনি কাজও শুরু করেছিলেন। তবে ভুল বোঝাবুঝির জন্য কাজটি শেষ করতে পারেন নি।

এ সময় চসিক প্রশাসকের একান্ত সচিব মুহাম্মদ আবুল হাশেম, প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ এ কে এম রেজাউল করিম, নির্বাহী প্রকৌশলী ফরহাদুল আলম, বিপ্লব কুমার দাশ, প্রকৌশলী মির্জা ফজলুল কাদের, অতিরিক্ত প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা মোরমেদুল আলম চৌধুরী, সাবেক কাউন্সিলর জহর লাল হাজারী, আবুল মনসুর, মাহবুবুল হক সুমন, নোমান লিটন, কাউন্সিলর প্রার্থী পুলক খাস্তগীর, আব্দুস সালাম মাসুম, মহিউদ্দিন শাহ, রুমকি সেনগুপ্ত, কামরুল হক, জানে আলম, ডা. অঞ্জন কুমার দাশ, সোলায়মান সুমন, ফরমান উল্লাহ, শহীদ উল্লাহ লিটন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।


নিউজটি শেয়ার করুন

সাবস্ক্রাইব ইউটিউব চ্যানেল