বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে পানিবন্দি লাখো মানুষ

বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে পানিবন্দি লাখো মানুষ

 নিজস্ব প্রতিবেদক
  ২০১৯-০৭-১৬: ০১:৫১ পিএম

বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামে কয়েকদিন ধরে পানিবন্দি বিভিন্ন উপজেলার মানুষ। রান্না-বান্না, যাতায়াতসহ ব্যাহত হচ্ছে নিত্যকাজ। বৃষ্টি কমায় পানি কিছুটা কমতে শুরু করলেও দিশেহারা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ।

পানিতে তলিয়ে আছে মাঠের পর মাঠ। তাতে, ফসলের খেততো বটেই পানিতে থইথই ঘরবাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনা। প্রবল বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে গত কয়েকদিন ধরেই এমন পানিবন্দী চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার হাছনদন্ডী এলাকা। শুধু এখানেই নয়, উপজেলার দশ ইউনিয়নের নয়টিই জলমগ্ন হয়ে পানিবন্দী এখানকার দুই লাখেরও বেশী মানুষ।

বন্যার কারণে বাড়িঘরে পানি উঠে চরম দুর্বিষহ দিন কাটছে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষজনের। শুধু চন্দনাইশই নয়, পাশের সাতকানিয়া উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নও তলিয়ে আছে বানের পানিতে। তাতে বিপুল আবাদি জমির ফসল, মাছের খামার, গবাদী পশু বন্যায় ভেসে গিয়ে তৈরী হয়েছে এক দুর্বিসহ অবস্থার।

এদিকে বন্যাকবলিত অনেক এলাকায়ই এখনো পৌছেনি ত্রাণসামগ্রীসহ প্রশাসনের সহায়তা। তবে প্রশাসন বলছে, চালসহ তৈরি করা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে দুর্গত এলাকায়। দুই দিন ধরে তেমন বৃষ্টিপাত না থাকায় পানি কমতে শুরু করায় স্পষ্ট হয়ে উঠছে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি।

ভয়াবহ বন্যার পানিতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন সাতকানিয়া উপজেলার মানুষ। টানা বৃষ্টিতে উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের মধ্যে প্রায় সবগুলোই প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে নলুয়া, ঢেমশা, কেঁওচিয়াসহ ছয়-সাতটি ইউনিয়নের অবস্থা ভয়াবহ। এসব এলাকায় পাঁচ থেকে ছয় ফুট পানি উঠেছে। সাঙ্গু নদীর পানি বিপদসীমার দেড় মিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

স্থানীয়দের অনেকে বাড়ি ঘর ছেড়ে শহরে ও আশাপাশের উপজেলার আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় খাবার এবং পানীয় জলের অভাব দেখা দিয়েছে ওই এলাকায়।রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এখন মানুষ নৌকা দিয়ে পারাপার হচ্ছে। ফসলের ক্ষেত, গোলার ধান, মৎস খামার, পশু ও বসত বাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে গবাদি পশুর।

এদিকে, বন্যার পানি পল্লী বিদ্যুতের সাব-স্টেশনে ঢুকে পড়ায় গত ৪ দিন ধরে উপজেলার কেওচিয়া, সোনাকানিয়া, মাদার্শা ও আমিলাইশ ইউনিয়নের প্রায় ২০টি গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ আছে।

\

উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ মোবারক হোসেন বলেন, ‘রবিবার (১৪ জুলাই) সাঙ্গু নদীতে বিপদসীমার দেড় মিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছে। উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের মধ্যে প্রায় সবগুলো ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। বানভাসি মানুষের মাঝে ইতোমধ্যে ৯৫ মেট্রিক টন চাল বিতরন করা হয়েছে। এ পর্যন্ত জেলা প্রশাসন থেকে ৮০০ শুকনো খাবারের প্যাকেট এবং উপজেলা পরিষদের উদ্যোগে আরও সাড়ে তিন হাজার শুকনো খাবারের প্যাকেট ও বিতরন করা হয়েছে।’

এদিকে টানা বৃষ্টিতে চন্দনাইশ উপজেলার কাঞ্চনাবাদ, হাশিমপুর, বরমা, বরকল, জোয়ারা, ধোপাছড়ি, বৈলতলি ও দোহাজারির অধিকাংশ এলাকা পানিতে প্লাবিত হয়েছে। টানা এক সপ্তাহ বন্যার পানিতে ভাসার পর গত রোববার (১৪ জুলাই) রাত থেকে বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। কিছু কিছু গ্রামীণ সড়কের উপর দিয়ে এখনো প্রবাহিত হচ্ছে বন্যার পানি। বন্যাকবলিত অসংখ্য মানুষ মানবেতর জীবন-যাপন করছে।

পুরো সপ্তাহ জুড়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার জাতীয় মহাসড়কের দক্ষিণ হাশিমপুর বড়পাড়া (কসাইপাড়া) অংশে বন্যার পানি প্রবাহিত হলেও গতকাল থেকে যানবাহন চলাচল কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। বন্যার পানিতে গ্রামীণ সড়ক ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়েছে।

দোহাজারী সড়ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার গাছবাড়িয়া-চন্দনাইশ-বরকল (শহীদ মুরিদুল আলম সড়ক) জেলা সড়কের সাতঘাটিয়া পুকুর পাড় থেকে বরকল ব্রিজ পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার জুড়ে গত ২ দিন ধরে ৪ ফুট পানির নিচে ডুবে আছে। এছাড়া পটিয়া-চন্দনাইশ-বৈলতলী জেলা মহাসড়কের ৯ম কিলোমিটার থেকে ১১তম কিলোমিটার পর্যন্ত সড়ক ৩ দিন ধরে ৩ ফুট পানির নিচে ডুবে আছে। এ দু’টি সড়কে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৩০ কোটি টাকা।

চন্দনাইশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আ ন ম বদরুদ্দোজা বলেন, "অবিরাম বর্ষণের ফলে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চন্দনাইশে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। উপজেলার শতকরা ৮০ ভাগ লোক পানিবন্দি হয়ে আছে। পানিবন্দী মানুষের মাঝে সরকারি ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে। স্ব-স্ব ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের কাছ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে, বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম। এ পর্যন্ত বর্নাত্যদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে ৪৫ মেট্রিক টন চাল, মজুদ রাখা হয়েছে আরো ১৫ মেট্রিক টন ত্রাণ।"

গত ১০ দিনের ভারি বৃষ্টিতে পাহাড় ধস ও বন্যার পানিতে ভেসে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে ৩ জন নিহত হয়েছেন। তারা হলেন-জঙ্গল খিরামের বাসিন্দা কালেন্দী রাণী চাকমা (৪০), জাফতনগর ইউনিয়নের নাসির উদ্দিনের ছেলে মহিউদ্দিন ইমতিয়াজ (২০) ও  লেলাং ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মফিজুর রহমান।
 


নিউজটি শেয়ার করুন

সাবস্ক্রাইব ইউটিউব চ্যানেল