কোরবানীর মাংসের হাট!

কোরবানীর মাংসের হাট!

 নিজস্ব প্রতিবেদক
  ২০১৯-০৮-১২: ০৯:০৮ পিএম

মাংসের হাট সবার চেনা। কিন্তু কোরবানীর মাংসের হাটের খবর কি সবাই জানেন? হ্যা, এই হাটের অপেক্ষায় থাকেন হাজার হাজার মানুষ। বিশেষত; যাদের সামর্থ নেই কোরবানী দেয়ার, এমন মানুষরা এই হাটের জন্য অপেক্ষায় থাকেন। এই হাটের বিক্রেতা কয়েক শ্রেণীর। এদের কেউ কসাই বা কোরবানী কেন্দ্রিক গরু-ছাগল জবাই কাজের মৌসুমী শ্রমিক, কেউ ফকির, আর কেউ বাড়ীর চাকর, দারোয়ান। এরা ঈদের দিন সকাল থেকে বাড়ি বাড়ি ঘুরে এসব মাংস সংগ্রহ করেন। অনেকেই আবার একদিনের কসাই হয়ে কাজ করেছেন। কাটাকাটির পর সেখান থেকে পান মাংস। কোনো কসাই আবার টাকার বদলে মাংস নিয়েছেন। এসব মাংসই বিক্রি হচ্ছে অস্থায়ী বাজারগুলোতে।  
ঈদের দিন বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসে এই হাট। জমজমাট রূপপায় বিকেল বা সন্ধ্যা নাগাদ।

নগরীর দেওয়ানহাট মোড়। হাজার খানেক মানুষ। কেউ বিক্রেতা, আর কেউ ক্রেতা। সবার নজর মাংসের পোটলার দিকে। একেকটা পোটলা আসছে আর ঘিরে ধরছে কয়েকজন। চলছে দরদাম। কোন পোটলার দাম ৬ হাজার, কোনটা দাম দুই হাজার। এই দাম নির্ভর করে মাংসের মানের ওপর। তারপর চাওয়া-চায়ি, ঘাটাঘাটি। দরদামে বনিবনা হলে অর্থের লেনদেন। সব কিছু দ্রুত, কিছুটা চুপসারেও। 
কয়েকজন নারী। এসেছেন নেকাবে মুখ ঢেকে। পরিচয় দিলেন না লজ্জায়। দরদাম করছেন, কিন্তু সব কিছু মিলছেনা।  এমন অনেকে মাংস কিনতে দেখালাম এখানে সেখানে, আড়াল থেকে। 


কথা হয় কয়েকজন ক্রেতা-বিক্রেতার সাথে। আবদুর রহমান অপু। ২০/২২ বছরের তরুণ। বাড়ী ব্রাক্ষণবাড়িয়া হলেও পরিবারের সাথে থাকেন চট্টগ্রামে। একটি কলেজে ইন্টারমিডিয়েট-এ পড়ছেন। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কথা বলতে চাইলে সংকোচ ছাড়াই বললেন, কোরবানী দেয়ার সামর্থ নেই তাই বাবাকে সাথে নিয়ে এসেছেন কোরবানী মাংসের হাটে। প্রথমে গিয়েছিলেন অলংকার মোড়ে। দাম বেশী তাই কেনা সম্ভব হয়নি। ১৫ কেজির মতো মাংস কিনেছেন দেওয়ানহাট মোড় থেকে। 
কথা হয় কয়েকজন বিক্রেতার সাথে। পঞ্চাশোর্ধ কসাই বাবুল। এসেছেন মাত্র হাটে। কত কেজি মাংস এবং দাম কত? বল্লেন, ৮ কেজি, ৬হাজার টাকা। চলছে দামাদামি। জানতে চাইলাম, পুরো দিনে কয়টা গরু জবাই আর কাটাকুটা করলেন, জটপট জবাব, ৪টা। রোজগার ৫৫হাজার টাকা। বাড়তি এই কয়েক কেজি মাংস বিক্রি করতে এসেছেন হাটে। অদূর থেকে সত্তোরোর্ধ এক লোক ডাক। দেখালাম মোটাসোটা সাদা পাঞ্জাবী পড়া লোকটা। রিক্সার ওপর বড় এক বালতি মাংস। জানতে চাইলেন মাংস লাগবে? নিজের পরিচয় দিলাম। জানালেন, তার ঘরে কোরবানীর অতিরিক্ত মাংস, তাই বেচে দেবেন। পরক্ষণেই দেখালাম হাবভাব দেখিয়ে চলে যাচ্ছেন বিক্রি করবেন না বলে। 
আরেক জনের সাথে কথা, নাম আমিন। বয়স ৩০/৩২। ঈদের দিন কসাই কাজ করেন। বাড়ী নোয়াখালী। প্রয়োজনের চেয়ে বাড়তি চার কেজি মাংস বেচে দেবেন ১৫শ' টাকায়। মাংসের পোটলা নিয়ে দাঁড়িয়ে আরেক যুবকের নাম বাবুল। ১১শ' টাকায় বিক্রি করে দেবেন তার মাংসগুলো। নিজের জন্যও রেখেছেন কিছু মাংস। এখানে আবার কেউ কেউ চেয়ে নেয়া অল্প অল্প মাংস জমিয়ে ছোট ব্যাগে ভরে বেঁচতে এসেছেন।
শুধু কোরবানীর সামর্থহীন মানুষ নয়, অল্প দামে এই মাংস কিনছেন নগরীর বিভিন্ন রেস্তোরার মালিকরাও। জানালেন লেঅকজন। 
দেখা গেছে, ব্যাগ হিসাবে প্যাকেজ এবং কেজি দরে এসব মাংস বিক্রি হচ্ছে। প্রতিকেজি মাংস বিক্রি হচ্ছে থেকে ৪৫০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত। 
বাজারে বিক্রি হওয়া মাংসগুলো মূলত দানের জিনিসি হলেও এ নিয়ে রীতিমতো ব্যবসা দাঁড়িয়ে গেছে।

এর যেমন আছে প্রাথমিক সংগ্রাহক তেমনি আছে মধ্যস্বত্বভোগীও। মধ্যস্বত্বভোগীদের ক্ষেত্রে এসব মাংস হাতবদল হয় দুই দফা। প্রথমে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছ থেকে কম দামে কিনে নেন কিছু মৌসুমি ব্যবসায়ী। পরে বাড়তি লাভে তা বিক্রি করেন সাধারণ ক্রেতা ও রেস্তোরা ব্যবসায়ীদের কাছে।
এই হাটে আসা কোরবানীর সামর্থ্যহীন কলেজ ছাত্র আব্দুর রহমান অপুদের মতো লাখো মানুষের গল্প লুকিয়ে আছে, এখানে সেখানে । যাদের ভরসা, প্রতি কোরবানী দিনের এই হাট। 


 


ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন