এমপি দিদারের বাসায় মোশাররফ, নতুন মেরুকরণ সীতাকুণ্ডে!

এমপি দিদারের বাসায় মোশাররফ, নতুন মেরুকরণ সীতাকুণ্ডে!

 নিজস্ব প্রতিবেদক
  ২০১৯-০৮-২৫: ০৮:৪১ পিএম

সীতাকুণ্ডে আওয়ামী লীগে কোন্দল বহুদিনের। স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে তিন ভাগে বিভক্ত উপজেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ অঙ্গ সংগঠনগুলো। গত জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে এই কোন্দল নিরসনের উদ্যোগ নেয়া হলেও এক পর্যায়ে তা আরো চরম রূপ নেয়। পরিস্থিতির মুখে তখন বাতিল করতে হয় দলীয় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশররফ হোসেন এমপি’র সমাবেশ। সীতাকুণ্ড আওয়ামী লীগে এখনো সেই ধারা চলছে। এরি মধ্যে রবিবার (২৫ আগস্ট) সবাইকে চমকে দিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য দিদারুল আলমের বাসায় যান সাবেক মন্ত্রী ও চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের অভিভাবকখ্যাত ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি। তিনি দুপুরে এমপি দিদারুল আলমের সিটি গেইটের বাসায় মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন। প্রায় দুই ঘন্টা অবস্থান কালে এমপি দিদারসহ দলীয় নেতাদের সাথে কথা বলেন, স্থানীয় রাজনীতি, সাংগঠনিকসহ বিভিন্ন বিষয়ে।  

রোববার সন্ধ্যায় সংসদ সদস্য দিদারুল আলম তাঁর ফেইসবুকে কয়েকটি ছবি পোস্ট করেন। উপরে লেখেন, 'আজ আমার বাড়িতে আমার আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে এসেছিলেন আওয়ামীলীগ নেতা, সাবেক সফল মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার জনাব মোশারফ হোসেন এমপি মহোদয়।’ এর পর তা দলীয় নেতা-কর্মীরা একে একে নিজেদের ফেইসবুকে শেয়ার করতে থাকেন। এই পোস্টে নানা মন্তব্য করেন দলীয় নেতা-কর্মীসহ সাধারণ মানুষ। 

স্থানীয় সূত্র মতে, সীতাকুণ্ডে দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে নানা বিষয়ে মতানৈক্য বা বিরোধ থাকলেও সাবেক সংসদ সদস্য ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি এ বি এম আবুল কাসেমের মৃত্যুর পর কোন্দল তীব্রতর হতে থাকে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনগুলো ত্রিধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই তিন পক্ষ হচ্ছে,  সংসদ সদস্য দিদারুল আলম, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল বাকের ভূঁইয়া ও উপজেলা চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবলীগের সভাপতি এস এম আল মামুন।  তিন নেতাই ছিলেন গত জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশী। ত্রিমুখী এই কোন্দল নিরসনে গত জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে কেন্দ্রীয় সংগঠনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়া হয়। এর অংশ হিসাবে ২০১৮ সালের ২২ সেপ্টেম্বর সীতাকুণ্ড সদরে সমাবেশের ঘোষণা দিয়ে প্রচারণা চালানো হয়। যে মঞ্চে বিবদমান সব পক্ষকে নিয়ে বক্তব্য দেয়ার কথা আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, তৎকালীন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি’র। সমাবেশের আগে বা পরে বিবদমান তিন পক্ষের নেতাদের নিয়ে আলাদা বৈঠকেরও কথা ছিল তখন।

কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে বাতিল হয় সেই সমাবেশ। এজন্য তিন নেতা পরস্পর পরস্পরকে দোষারোপ করেন। এসএম আল মামুন এবং বাকের ভুইয়া সরাসরি দায়ি করেন সংসদ সদস্য দিদারুল আলমকে। তবে দিদরুল আলম তখন তা অস্বীকার করেন। ওই সময় সীতাকুণ্ডে চাউড় হয়, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন মীরসরাই আসনে তাঁর পুত্র মাহবুবুর রহমান রুহেলকে ছেড়ে দিয়ে সীতাকুণ্ড আসন থেকে নির্বাচন করতে চান। কোন্দল নিরসনের কথা বলা হলেও মূলত: এটি তাঁর প্রাক নির্বাচনী শোডাউন। সীতাকুণ্ডে আওয়ামী লীগরে একটি পক্ষ তখন নাম প্রকাশ না করে বলেছিল, সংসদ সদস্য দিদারুল আলম তাঁর নিশ্চিত মনোনয়ন হারানো ঠেকাতে কেন্দ্রীয় নেতাদের দিয়ে এই সমাবেশ স্থগিত করেছিলেন। তবে সেই সমাবেশ স্থগিত বা বানচাল যে যাই বলুক, শেষ হাসি হাসেন এমপি দিদারুল আলম। ত্রিমুখী কোন্দলে প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়ে যান আব্দুল্লাহ আল বাকের ভূইয়া। চূড়ান্ত মনোনয়ন নিয়ে দ্বিতীয়দফা জয়লাভ করেন দিদারুল আলম। 
ওই ঘটনার পর থেকে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোশাররফ হোসেনের সাথে সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না সংসদ সদস্য দিদারুল আলমের। যা বলতে গেলে সবার মুখে মুখে। সূত্র মতে, সেই থেকে সীতাকুণ্ডে কোনঠাসা হয়ে পড়েন প্রবীন নেতা মোশাররফ হোসেনের পক্ষের নেতাকর্মীরা। বিশেষত: সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও দলের উপজেলা সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল বাকের ভূইয়া ও তার সমর্থকরা। সম্প্রতি শুনা যাচ্ছে, সীতাকুণ্ডে আবারও নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে চান উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মোশররফ হোসেন। সীতাকুণ্ড উপজেলা আওয়ামী লীগের আসন্ন কাউন্সিলে তাঁর পক্ষের নেতাদের কমিটিতে স্থান করে দেয়াই প্রবীন এই নেতার টার্গেট। আর সেই তালিকায় শোনা যাচ্ছে ইতিপূর্বে দল থেকে বহিস্কৃত কয়েকজন নেতার নাম। এমন খবরে সাম্প্রতিক সময়ে সীতাকুণ্ডে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে শুরু হয় নতুন হিসেব নিকেষ।

সংসদ সদস্য দিদারুল আলমের বাসায় হঠাৎ ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের উপস্থিত হওয়া, বাড়ীতে মধ্যাহ্নভোজে অংশগ্রহণ এসব নিয়ে স্থানীয় নেতাদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে নিলেও কারও কপালে চিন্তারভাজ। এমপি দিদারুল আলমের বাসায় যাওয়া আর কুমিরায় সমাবেশে অংশ নেয়ার বিষয়টি রহস্যময় বলে মনে করছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতা। তার প্রশ্ন দীর্ঘদিন পর কেন হঠাৎ সীতাকুণ্ড প্রীতি দলের প্রবীণ নেতা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের? তার মন্তব্য, উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনের আগ মুহূর্তে এই দেখা-দেখির মধ্যে লুকিয়ে আছে হয়তো কোন রহস্য। 
সংসদ দিদারুল আলমের বাসায় উপস্থিত এক নেতা বলেন, বেলা আড়াইটার দিকে ইঞ্জিনিয়ার মোশররফ হোসেন এমপি দিদারুল আলমের বাসায় উপস্থিত হন। এ সময় তার সাথে উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র কয়েকজন নেতাও ছিলেন। খাওয়া-দাওয়াসহ প্রায় দুই ঘন্টা অবস্থানকালে নানা বিষয়ে কথা হয়। এক পর্যায়ে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোশাররফ হোসেন এমপি দিদারুল আলমকে স্থানীয় ভাষায় বলেন, 'আই মরি আর বাঁচি তু'ই (দিদারুল আলম) আবার এমপি।' বিকেল সাড়ে চারটায় মোশাররফ হোসেন এমপি সীতাকুণ্ডের কুমিরায় জাতীয় শোক দিবসের এক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে চলে যান।


এ ব্যাপারে সংসদ সদস্য দিদরুল আলমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তিনি (মোশাররফ হোসেন) আমার বাসায় আসার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, আমি তাকে দাওয়াত দিয়েছি। এ সময় দলের উত্তর জেলা নেতারাও ছিলেন। তবে কি বিষয়ে কথা হয়েছে তা তিনি বলতে চাননি।

আওয়ামী লী‌গের অপর এক‌টি সূত্র ম‌তে, সম্প্র‌তি সীতাকু‌ণ্ডে দলীয় সমা‌বেশে অংশ নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ ক‌রেন ইঞ্জি‌নিয়ার মোশাররফ হো‌সেন। আগ্রহের বিষয়‌টি জানান, স্থানীয় সাংসদকে। এর সূত্রধ‌রে নিজের বাড়ীতে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এই নেতার সৌজন্যে মধ্যাহ্ন‌ভো‌জের আয়োজন ক‌রেন সংসদ সদস্য দিদারুল আলম। এতে পাশাপা‌শি সংসদীয় এলাকার দুই সাংসদের ম‌ধ্যে দীর্ঘ‌দি‌নের দূরত্ব ক‌মে আসবে বলে মনে করছেন স্থানীয় নেতা-কর্মীরা। যার ইতিবাচক ফল স্থানীয় রাজনী‌তি‌তে পড়‌বে ব‌লে ম‌নে ক‌রেন তারা। ত‌বে এতে না‌খোশ আরেক‌টি পক্ষ। ওই পক্ষটি ক‌য়েক‌দিন আগে মোশাররফ হো‌সে‌নের সা‌থে দেখা ক‌রে সমা‌বে‌শে যোগ না দেয়ার অনু‌রোধ ক‌রেন। কিন্তু তা‌ কা‌নে নেন‌নি ইঞ্জি‌নিয়ার মোশাররফ হো‌সেন। র‌বিবার কু‌মিরায় অনু‌ষ্ঠিত শোক দিব‌সের সমা‌বেশ‌টির আয়োজক সাংসদ দিদারুল আল‌মের প‌ক্ষের লোকজন। এই সমা‌বে‌শে উপ‌জেলা চেয়ারম্যান এস এম আল মামুন ও তার অনুসারীরাও যোগ দেন। ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের মন রক্ষায় আব্দুল্লাহ আল বা‌কের ভূইয়াও যোগ দিতে বাধ্য হন বলে সুত্রটি উল্লেখ করেন। সংশ্লিস্টরা বলছেন, এর ফ‌লে সীতাকু‌ণ্ডে আওয়ামী লীগরে রাজনী‌তি‌তে শুরু হয়েছে নতুন মেরুকরণ। চলছে নতুন হিসেব নিকেষ।


সাবস্ক্রাইব ইউটিউব চ্যানেল